◆ কাজী রুনা লায়লা খানম / বাইশে শ্রাবণে

কাজী রুনা লায়লা খানম / বাইশে শ্রাবণে

সময়ের গভীর অসুখ এখন। এ বড় সংকট কাল!  বড় বিপন্ন এ মানবসভ্যতা। এ বছর তোমার নামে হয়তো বাঁধা হবে না কোনো মঞ্চ। সকালের প্রভাতফেরীতে গেয়ে উঠবেনা কচিকাঁচাদের সম্মিলিত স্বর " আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো, এ জীবন পূণ্য করো দহন দানে।" সকাল সকাল পবিত্র স্নান সেরে লালপেড়ে গরদের শাড়িখানি পরে খোঁপায় রজনীগন্ধার মালা জড়িয়ে একবুক নিবেদন নিয়ে গানের দিদিমনি মঞ্চে উঠবেন না। মাইকে শোনা যাবেনা "জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।"  স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সুললিত মার্জিত স্বর ভেসে আসবেনা "আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুণী উঠলো রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠলো আলো পুবে পশ্চিমে!"  এ কবিতা শুনতে শুনতে সত্যকার আলো হয়ে জ্বলে উঠতে দেখবেনা স্যরের চোখ মুখ! স্কুলের ছেলেমেয়েদের নাচের মুদ্রায় আজ আর ফুটে উঠবেনা "আমার মুক্তি আলোয় আলোয়" কিংবা চন্ডালিকার সেই অতুল্য দৃশ্য "যেই মানব আমি, সেই মানব তুমি ...।"শুধু সোশাল মিডিয়ায় গ্রুপে গ্রুপে চলবে তোমার এডিট করা ছবির প্রদর্শন। তোমার গানে কবিতায় ছয়লাপ হবে সমাজমাধ্যমের দেয়াল। শুধু তোমার অক্ষর হতে ক্ষরিত আলোয় ভরে উঠবে কিনা কোনো বুকের পাঁজর সেটাই জানা হবেনা । তবু বাইশে শ্রাবণ আসবে। আসবে নিজস্ব মহিমায়। 

সংসারের তেল নুন লকড়িতে আকন্ঠ ডুবে থাকা মেয়েটি এ বছর পাঁচটা সংসারী চোখের অগোচরেই গীতবিতানের অক্ষরনদীতে সেরে নেবে পবিত্র স্নান।পঞ্চপ্রদীপ সাজাবে,পুবের দেয়াল হতে নামিয়ে আনবে তোমার বাঁধানো ছবির ফ্রেম। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে যত্নে মুছে নেবে অদৃশ্য ধুলোর কণা। যত্নে চন্দন আঁকবে তোমার দ্যুতিময় কপালে। ধূপদানে সাজাবে চন্দনগন্ধা ধূপ। কাঠমালতি আর গন্ধরাজে নৈবেদ্যের থালা। আর আপনমনে মন খুলে গাইবে "...যা কিছু জীর্ণ আমার দীর্ণ আমার আপন হারা, তাহারই স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা ....শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ..." হাঁটুজল নদীটির বাঁকে তোমার সাথে যার অলৌকিক সাক্ষাৎ ঘটেছিলো!

আজীবন বাউন্ডুলে মেয়ে। গাছেদের মজলিশে যার নিত্য আনাগোনা, যে জানে হাঁটুজল মুজনাই কার ছোঁয়া পেয়ে অমন ভরা যুবতী হয়ে ওঠে। শ্রাবণের সাথে তার গোপন সম্পর্কের নাড়িনক্ষত্র। জানে লেবুফুলের সাথে জোনাকিদের নিভৃত অভিসারের হালহকিকত! আকাশের মুড সুইংএর খবর যার নখদর্পণে সে কি সইতে পারে "রাঁধার পরে খাওয়া, আর খাওয়ার পরে রাঁধা?" দু পায়ে তার হাজার বাঁধন, জীবনজুড়ে সহস্র তার বাধা। গোপন রাতে পাঁজর পোড়ে। ফোঁটা ফোঁটা রক্তক্ষরণ হয়।  পিঠ ঠেকে যায় চারদেয়ালে। মুখ থুবড়ে পড়ে।আর প্রতিবার প্রার্থনায় নতজানু হয় তোমার অক্ষরের কাছে "....ওহে পবিত্র ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো।" তুমি আলো চোখে এসে দাঁড়াও নিভৃত উঠোন খানিতে।খাদের কিনার হতে  বুকে ভর করে উঠে দাঁড়ায় মেয়ে তোমাকেই আঁকড়ে! 

কতোবার ভেঙেছে সে  নিভৃতে একাকী। মন মরে গেলে কতোটা জরুরী বলো শরীরী বেঁচে থাকা? যদি ক্ষয়ে যায় শব্দের পরমায়ু?যদি নিভে আসে অক্ষরের আলো, ঠোঁটের কোলাজে আঁকা সলাজ হাসিটি বলো হতে পারে কতোটা জোরালো? ভেতরঘরের অবাধ্য বারিষনামা। ভাঙাচোরা মন আর তালিতাপ্পির জীবনে  সিঁধকাঠি নিয়ে এগিয়ে আসে কেউ কেউ। নিঃস্ব করে রেখে যায় বন্ধুবেশী হাত। দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হয়েছে প্রহর, অযাচিত অবাঞ্ছিত রাত।দীপ নেভা সেই রাতে সমস্ত কালোর ভিতর ফুটে ওঠে তোমার অনশ্বর দুটি চোখ।একলামেয়ে এভাবেই পূর্ণ হয়ে ওঠে  "সকালবেলায় চেয়ে দেখি, দাঁড়িয়ে আছো তুমি এ কী! ঘরভরা মোর শূন্যতারই বুকের 'পরে"

©কাজী রুনা লায়লা খানম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ