রুমকি রায় দত্ত



কিছুদিন ধরেই মনমরা আর অন্যমনস্ক শ্রীতমা।সকালে কলেজে আসার পথে দু’বার দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচেছে।  অন্য দিনের থেকে আজ ওর মনটা একটু বেশিই খারাপ।ঠিক এক বছর আগে আজকের দিনেই তো রণজয় ওকে মনের কথা জানিয়ে ছিল। সেই রণজয়,ওর সাথে প্রতারণা করেছে,গা ভাসিয়েছে অন্য নদীর স্রোতে। ওর সবথেকে আকর্ষক কাজল পড়া চোখ দুটো থেকে যেন জল গড়িয়ে আসতে চায়। বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসে। আজও ওর বিশ্বাস হয়না রণজয় ওকে ঠকাতে পারে! অথচ না বিশ্বাস করারও কোনো কারণ নেই। রণজয় ওকে নিজে ফোন করে জানিয়েছে। শীতমা মেয়েটি কে দেখেনি এখনো,শুনেছে মেয়েটি এ বছর প্রথম বর্ষের ছাত্রী। রণজয় ঐ কলেজেরই তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। যদিও শ্রীতমা গার্লস কলেজে পড়ে,তবুও রণজয়ের সাথে ওর প্রেমটা শুরু হয় অর্পিতাদের বাড়িতে। রণজয় অর্পিতার দাদার বন্ধু। শ্রীতমার ভালবাসায় তো কোনো খাদ ছিল না,তবুও ধরে রাখতে পারে নি রণজয়কে।

দুটো ক্লাস হওয়ার পর থেকেই শুধু বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে ওর। মনের সাথে শরীরও ক্লান্ত। অথচ আজ যার জন্য ওর এই অবস্থা সে হয় তো এখন তার নতুন  প্রেমিকার বাহু ডোরে বসে আছে। শ্রীতমার বাবা রণজয়দের কলেজেই চাকরি করে। ঝুঁকি নিয়েও শ্রীতমা রণজয়ের সাথে দেখা করতে যেত ওদের কলেজের পাশে গঙ্গার ধারে। হঠাৎ ওর মন জুড়ে পুরানো আবেগ যেন বাঁধ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল। শ্রীতমা সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। ঠিক একই জায়গা, শুধু শ্রীতমার জায়গায় বসে আছে জিনিয়া,রণোর নতুন প্রেমিকা। ওরা ভীষণ ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে আছে। শ্রীতমা কখনও রনজয়ের সাথে এমন ভাবে বসেনি। কেমন বিশ্রী ভাবে রণো ওর হাতটা বেড় দিয়ে মেয়েটার  বুকের কাছে সামান্য পেট ছুঁয়ে  ধরে আছে। ইচ্ছা করলো ছুটে গিয়ে মেয়েটা কে তুলে একটা চড় কষাতে। মনে মনে ভাবলো,এই অসভ্য মেয়েটার জন্যই রণজয়ের আজ এত অবনতি। রণজয় তো এত নোংরা ছিলনা! এই মেয়েটায় ওর রণজয়কে এত নিচে নামিয়েছে! মেয়েটা ওর রূপ-যৌবন দিয়ে রনজয়কে বশ করেছে। রণজয় কি এমন ভাবেই ওকেও পেতে চেয়েছিল? ----ইচ্ছা করলো ছুটে গিয়ে দু’হাতে রণজয়ের মুখটা ধরে চুমুতে ভরিয়ে দিতে। কিন্তু ওর পক্ষে এ কাজ করা কঠিন,এমন একটা কাজ করার কথা মনে এলো কি করে? ---ভাবতেই ওর নিজের প্রতি ঘৃণা  হলো। আসলে ক্ষণিকের ঈর্শা মনে পাপ সৃষ্টি করেছিল। ওর একটা আলাদা রুচিবোধ আছে,কোনোদিনই ও নিজেকে এই ভাবে তুলে দিতে পারতো না।আসলে রণজয় নির্বোধ,ভালোবাসাটায় বোঝে না।

সাইকেল নিয়ে বাড়ির দিকেই চলতে থাকে। মনে এক অদ্ভূত বোধ জন্মায়—ভালোবাসা আসলে ক্ষমা। কিন্তু ওর একটা মন চায় প্রতিশোধ আর ঘৃণা। শ্রীতমা আপন মনেই বলে ওঠে –‘না—আমি কিছুতেই রণোকে ঘৃণা করতে পারবো না’। কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ মনের নিঃসঙ্গতা ভালোবাসা পাওয়ার আশায় ছটফট করতে থাকে। মনটা দুমরে মুচরে যেন ছারখার হতে থাকে। প্রকৃতির নিয়মে স্থান কখনও শূন্য থাকতে পারে না।ভালোবাসার পূর্ণপাত্র থেকে উবজে পরা ভালোবাসা শূন্য পাত্র খোঁজে। রণজয় ওর মনে যে অপূর্ণতা সৃষ্টি করেছে,সেই অপূর্ণতা যেন পূর্ণতা পেতে চায়ছে।মনে মনে দৃহ সিদ্ধান্ত নেয়,আজ থেকে নতুন করে বাঁচা আর পথচলা।

বাড়ি ফিরতেই মায়ের ধমক—‘কোথায় ছিলি? —কখন থেকে ফোন করছি,চিন্তায় আমার বুকটা ধড়ফড় করছে’। শীতমা অবাক চোখে তাকায়—অস্ফুটে বলে ‘ ফোন করেছিলে? —শুনতে পায় নি’। ---মোবাইলের মিস্‌ড কল লিস্ট খুলতেই দেখে তেরোটা মিস্‌ডকল। এগারোটা মার বাকি দুটো অজানা। আনমনে মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলে সোফার উপর। এখন এটা বিশেষ প্রয়োজনে লাগে না ওর। ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসতেই রান্নাঘর থেকে মিমির গলা ভেসে আসে ---‘কি রে, বসলি যে,তোকে একটু বেরোতে হবে তো, --রায় কাকু ফোন করে ছিল,ব্লাউজটা হয়ে গেছে’।

শ্রীতমা অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়,এখন বেরোনোর অফুরন্ত কারণ আছে অথচ রণজয় নেই,---এই বেরোনোর জন্য কত ছল-চাতুরিই নয়া ওকে করতে হয়েছে। কখনো জেরক্স,কখনো অর্পিতার বাড়ি থেকে বই আনা হরেক স্মৃতি যেন মনের কোনে উঁকি দিতে লাগলো।

[২]
দুপুরে সামান্য একটু শুয়ে ছিল,তাতেই চোখ দুটো ফুলে গেছে। আসলে ঘরে ফিরে আজ ও খুব কেঁদেছে। ঘর লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে চোখে-মুখে জল ছিটালো। বাইরের বারান্দায় ঝুলানো তোয়ালেটা দিয়ে চেপে চেপে মুখটা মুছে নিল। একটু পরেই ওর কেমিষ্ট্রির স্যার অভিকদা আসবে।দাঁড়ালো রেলিংটা ধরে।স্মৃতি তো পেন্সিলের দাগ নয় যে, রাবার দিয়ে মুছে দেওয়া যায়।সামনেই দাঁড়ানো তেঁতুল গাছটার দিয়ে তাকাতেই স্মৃতির পাতাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠিক ঐ তেঁতুল গাছটার নিচে রণজয় সাইকেল নিয়ে দাঁড়াত। সাইকেলে বসে একটা পা মাটিতে নামানো থাকতো।আবার কান্না পেতেই দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা চেপে ধরল। হঠাৎ টেবিলে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো।  শ্রীতমা ছুটে এসে ফোনটা ধরতে গেল,একটা অচেনা নাম্বার।বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল...রণ নয় তো?আগে মোবাইলটা সারাদিন বাজতো এখন আর বাজে না। ধরার আগেই অভিক স্যার ঢুকে পরেছে ঘরে।অদ্ভূত চোখে তাকাচ্ছে। রণজয় এর কথা অভিকদা জানতো,এখন স্যারের পথের কাঁটা আর নেই দেখে বেশ খুশি খুশি ভাব। শ্রীতমা অভিকদার চোখের ভাষা ভালো করেই বোঝে। কিন্তু অভিকদা কে সে জায়গা কোনোদিনই দিতে পারবে না। শ্রীতমা বিরস মুখে বই নিয়ে বসে পড়ে অভিকের সামনে।

রাতে খাওয়া সেড়ে সবে মাত্র ঘরে এসেছে শ্রীতমা। এই কদিনে চোখের তলায় জমা কালির গাঢ় দাগটা দেখছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।আবার ফোনটা বেজে উঠলো,ঐ একই নাম্বার। চারবার রিং হতেই ও কলটা রিসিভ করল। ক্ষণিক নিরবাতা,লাইনটা কেটে দিতেই মেসেজ এলো—‘হু আর ইউ?’

শ্রীতমা নিরবে মেসেজে চোখ বোলালো। ক্ষণিক নিঃস্তব্ধতা কে ছিন্ন করে মোবাইলে আবার বেজে উঠলো মেসেজ টোন। শ্রীতমা আবার চোখ বোলালো,লেখা আছে ‘ তুমি কোথায় থাকো?’ বুকটা ছ্যঁৎ করে উঠলো ওর,---এ রণোর কোনো নোংরা খেলা নয়তো! সকালে রণোর যে নৈতিক পতন নিজের চোখে দেখে এসেছে ওর পক্ষে যে কোনো নোংরা খেলায় আর অসম্ভব নয়। শ্রীতমা বালিশের নিচে মোবাইলটা রেখে এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। আবার মোবাইলটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে সেই একই নাম্বার দেখে টিপে ধরলো সবুজ বোতামটা। ক্ষণিক নিরবতার পর ভেসে এলো এক ভারি পুরুষ কন্ঠ—‘ কি হলো, উত্তর দিচ্ছনা যে’।

শ্রীতমা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল—‘আপনি কে বলছেন?’
অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো---‘সেটাতো তুমিই ভালো বলতে পারবে’।
শ্রীতমা বলল—‘আমি?’
হ্যাঁ, তুমি।কারণ প্রথম মিস্‌ড কলটা তোমার নাম্বার থেকেই এসেছিল।
শ্রীতমার ভিতরে যেন আগুন জ্বলে উঠলো। চিৎকার করে বলল—‘ইউ লায়ার। ---তোমরা ছেলেরায় এমন লায়ার হও। প্রথমে মিথ্যা দিয়ে কথা শুরু করো, তারপর ভালোবাসার কথা বলো, শেষে ছুঁড়ে ফেলে দাউ’। শেষেরকথা গুলো বলার সময় যেন সামান্য গলা কেঁপে গেল। ---ছেলেটি বেশি কিছু বলার আগেই শ্রীতমা লাইনটা কেটে দিয়ে মোবাইলের সুইচ্‌ অফ করে দিলো। কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো বন্ধ মোবাইলের দিকে।  -----ঘরের যেদিকে তাকায় শুধু যেন রণজয়ের স্মৃতি গিলে খেতে চায়। মাঝে মাঝে শ্রীতমার মনে আগুন জ্বলে ওঠে। একটা প্রতিহিংসা যেন মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। শ্রীতমা উঠে আসে বারান্দায়।সামনের উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করে পুরানো স্মৃতিগুলোকে উড়িয়ে দিতে। আবার একবার মনে মনে সংকল্প নেয় নতুন করে বাঁচার।

[৩]
বাতাসহীন স্থানে একটু ফাঁক পেলেই যেমন বাতাস ভরে যায়,শ্রীতমার খালি মনটাও  আর ফাঁকা নেই। ভালোবাসার অসম্পূর্ণতা সৃষ্টি করে আরেকটা নতুন ভালোবাসার। রং নাম্বারটা কখন যেন চুপিসারে চেনা নাম্বার হয়ে উঠেছে। শ্রীতমা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ব্যাগটা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটা মেসেজ পাঠায় বিশালকে। প্রায় ছয়মাস হয়ে গেছে ওর আর বিশালের সম্পর্কটা অথচ এখনো কেউ কাউকে দেখেনি। এসে দাঁড়ায় আয়নার সামনে,নিজেকে এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে। --- নিজের অজান্তেই নিজেকে জিনিয়ার সাথে তুলনা করে ফেলে। পুরানো বইয়ের ভাঁজ থেকে বার করে আনে রণজয়ের ফটো। কতবার ছিঁড়ে ফেলতে গিয়েছে,প্রতিবারই হাত কেঁপেছে।----আজ আর ওর হাত কাঁপলো না। বারান্দার এক কোনে এসে আগুন ধরিয়ে দিল ফোটোটার একটা কোনে।নিমেষে পুরে ছাই হয়ে গেল রণজয়ের ফোটোটা। শ্রীতমা ছাই গুলো হাতে তুলে একবার গভীর নিঃশ্বাসে গন্ধ নেয় পোড়াছায়ের,তারপর ব্যালকনি থেকে উড়িয়ে দেয় খোলা বাতাসে। ঘরে এসে বেঁছে নেয় সুন্দর একটা জামা। বিশালের সাথে আজ প্রথমবার দেখা হবে। প্রসাধনের আলতো ছোঁয়ায় নিজেকে সাজিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাইকেল নিয়ে। ঠিক পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। শ্রীতমা এসে দাঁড়ায় অগ্নিকোন থিয়েটারের সামনে। থিয়েটারের সামনে প্রসারিত মাঠ। পাশে একটা ক্লাবঘর। একটা ছেলে ক্লাবঘর থেকে ঢুকে পড়ে থিয়েটার হলের মধ্যে। শ্রীতমা মুখ ঘোরায় অন্যদিকে। একটা রোগা লম্বাটে চেহারার ছেলেকে কিছু কাগজপত্র হাতে ওর দিকে আসতে দেখে হৃৎপিন্ড যেন দ্রুত গতিতে ছুটতে থেকে শ্রীতমার। অজানা আকর্ষণে সেইদিকে শ্রীতমা পা বাড়াতেই যাবে,এমন সময় পিঠে একটা আলতো হাতের স্পর্ষ পেয়ে থমকে যায়। পিছন ফিরিতেই চমকে ওঠে, কিছুক্ষণ আগেই এই লোকটিকে দেখে ওর হনুমানের বংশধর বলে মনে হয়েছিলো। ---নিমেষে চোখের সামনে সব যেন ওলটপালট হয়ে যায়। ----যেন এক যন্ত্র চালিত পুঁতুলের মত বলে ওঠে ---‘ আমায় মাফ্‌ করবেন বিশাল বাবু, আমি শ্রীতমা নয়,আমি ওর বন্ধু অর্পিতা। ---বিশাল কিছু বলার আগেই শ্রীতমার সাইকেল দূরে সরতে সরতে মিলিয়ে যায় অনেক সাইকেলের মাঝে।

পরিচিতি 


রুমকি রায় দত্ত রুমকি রায় দত্ত Reviewed by Pd on জুলাই ১১, ২০১৫ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

banner image
Blogger দ্বারা পরিচালিত.