ঘটনাচক্রে আমার ফতেমার সঙ্গে পরিচয় হয় । বছর কুড়ি আগের ঘটনা । আমি তখন আমার গ্রামের বাড়ীতে । একটু আধটু হোমিওপ্যাথী চিকিৎসা করার রোগ ছিল । আমার সঙ্গে সবসময় ছায়ার মতো থাকতো আমার গ্রামেরই একটি ছেলে বেতাল । কম্পাউন্ডার কাম হেল্পিং হ্যান্ড । পাশের গ্রামে রুগী দেখতে গেছি । সঙ্গে বেতাল । শ্রাবণ মাস, মেঘলা আকাশ ছিলই হঠাৎ বৃষ্টি একেবারে মুষলধারে । বৃষ্টি আর থামে না । খিদেয় নারী ছিঁড়ছে বেতালের । বেতালের সেই বছরই পৈতে হয়েছে । বাড়ী থেকে কড়া নির্দেশ বাইরের কিছু খাবে না ফল ছাড়া । পায়ে হাঁটা রাস্তা কাদায় পা পিছলে যাচ্ছে তারই মাঝে রওনা দিলাম । হঠাৎ পিছন থেকে একটা নারী কন্ঠ .... ডাক্তার ভাবী ! একটু শুনবেন ? পিছন ফিরে দেখি বছর ২৫/৩০ এর এক মহিলা ডাকছে । আমি থমকে যেতেই ও পায়ে পায়ে এগিয়ে এল । রূপ যেন ফেটে পড়ছে মেয়েটির । কেঁদেই চলেছে ক্রমাগত । বৃষ্টির জল চোখের জল মিলে মিশে একাকার । আমি বলি, কি হয়েছে কাঁদছো কেন ? আল্লা গো ! আমার বুবু বুঝি বাঁচবে না । আপনি দয়া করে চলেন ডাক্তার ভাবী ! বুবুর খুব কষ্ট । চলো .... আমি এগোতেই বেতাল বলল, আবার ? আমি চোখের ঈশারায় ওকে থামিয়ে মেয়েটিকে অনুসরন করলাম ।
ইঁটের দেওয়াল, মেঝেটা পাকা, কিন্তু উপরে টালি দেওয়া দু কামরার বাড়ী। মস্ত উঠোন।হাঁস মুরগী চরছে, কিছু গাছপালাও আছে । রোগিনীর ঘরে সরাসরি নিয়ে গিয়ে ঢুকল মেয়েটি । বছর ষাটের এক মহিলা শুয়ে গোঁঙাচ্ছে । ঘরটা বেশ অন্ধকার । ভ্যাপসা গন্ধ । আমি জানালা খুলে দিতে বললাম । তোমার নাম কি ? জী .... ফতেমা । আমি বলি, ফতেমা কান্নাকাটি নয় । যাও জল গরম করে বোতলে ভরে নিয়ে এসে বুবুর পায়ে সেক দাও । কারন রোগিনীর হাত পা ঠান্ডা । এদিকে তীব্র জ্বরে বেহুঁস । আমি ওষুধ দিচ্ছি আধ ঘন্টা অন্তর খাওয়াবে । বেতালও বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে । গরম জলের বোতল দিয়ে নিজেই সেক করছে । ফতেমা কেঁদেই যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম উনি তোমার কে হন ? ফতেমা কাঁদতে কাঁদতে বলে .... সতীন । আমি চমকে উঠি । সতীনের জন্য এত কান্না ? তারপর ফতেমা যা বলল আমি সংক্ষেপে তা জানাচ্ছি । রোগনীর নাম নসীবন বানু । পাঁচটি সন্তানের মা ।স্বামী ফজলু মিঞা সম্পন্ন গেরস্ত । জানলা দিয়ে পাশের বাড়ীটি দেখায় বেশ বড় দালান বাড়ী ।ফজলু মিঞার দায়িত্ব কর্তব্য শেষ । ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, তারা ভালই আছে । তাই তিনি হজযাত্রা করলেন । পয়গম্বরের দোয়া নিয়ে একদিন ফিরলেনও মক্কা থেকে । কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এলেন ফতেমাকে ।তখন সে ষোল বছরের । একেবারে নিকা করে । নসীবন বানু তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেও ফতেমাকে একটি কথাও বলেনি বরং মিঞার সঙ্গে ঝগড়া করে বলেছে এত্তটুকুন মেয়্যার জীবন লষ্ট করতে তুমার লজ্জা হলো না মিঞা ? ইট্যা তুমি কি করল্যা ? মিঞা বলে, লষ্ট করল্যাম কুন্ঠে ? অকে তো জীবুন দিলাম । না খেয়্যা মরছিল, আমি ঠাঁই দিলাম । অকে আমি পাঁচ বিঘা জমি লিখে দিয়্যাছি । মিঞা অবিচার করেনি ফতেমার উপর । আর নসীবনও ফতেমার উপর মাতৃস্নেহ ঢেলে দেয় । সতীন নয় যেন মা মেয়ে । কিন্তু ফতেমার কপালে সুখ সইল না । দুবছরের মাথায় মিঞার ইন্তেকাল হল । ফতেমা পড়ল ফাঁপরে । মিঞার ছেলেরা এমনিতেই ফতেমাকে সহ্য করতে পারতো না । বাপের ভয়ে চুপ ছিল সবাই । বাপ মরতেই প্রথমেই ওরা ফতেমাকে বাড়ী থেকে তাড়ালো । এই বাড়ীটা ফতেমাকে দিয়ে গিয়েছিল মিঞা ।কথা ছিল পাট উঠলে লাভের টাকা থেকে ছাদ বানিয়ে দেবে । সে সময় মিঞা পেল না । ফতেমা সারা দিন বিড়ি বাঁধে । জমির যা ফসল পায় আর বিড়ি বাঁধার পয়সায় তার চলে যায় । তাতেও বুঝি আপত্তি ছিল ওর সৎ ছেলেদের । মা নসীবনকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিল ফতেমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা চলবে না । নসীবন মানতে নারাজ । ছেলেরা শাস্তি হিসাবে মায়ের খাওয়া বন্ধ করল ।চলল নানা অত্যাচার । সেদিন ফতেমা নিজেকে সংযত রাখতে পারেনি । সোজা ওদের বাড়ি ঢুকে বলেছিল ... চল বুবু তুমি আমার সাথে । আমি যদি খেতে পাই, তুমিও পাবে । আর এই কুলাঙ্গারের দল ! যেদিন বুবুর ইন্তেকাল হবে তোদের হাতের এক মুঠো মাটিও যেন কবরে না পড়ে । মায়ের পায়ের তলায় নাকি জন্নৎ ! হায়রে সন্তান এর থেকে বাঁজা থাকা ভাল ।সেই থেকেই নসীবন ফতেমার কাছেই আছে ।দুই সতীনে ভালই আছে । অবসর পেলেই ফতেমা নসীবনকে কোরান পড়ে শোনায় । পীর দরবেশের মাজারে নিয়ে যায় । কিন্তু ছেলেরা মায়ের কাছে আসেনি ।বরং এখনও ফতেমাকে উত্যক্ত করে । এই ক’বছরে ফতেমা অনেক পরিণত হয়েছে । সে আর ভয় পায়না ।নসীবন অনেক চেষ্টা করেছে ফতেমার নিকা করাতে । দেখতে সুন্দরী । কাজেই যেচে অনেক সন্মন্ধ এসেছে । ফতেমা বলে .... নিকার কথা যে বুলছ বুবু ! আমার নতুন মিঞা এসে আমাকে নিয়ে যাবে । তোমাকে কে দেখবে শুনি ? নসীবন বলে খোদার রহমতে কেটে যাবে । ফতেমা রেগে গিয়ে বলে ছেলেদের লাথি খাবার জন্য পেট কামড়াচ্ছে ? নসীবন চুপ করে যায় ।ফতেমা মজা করে বলে তার চেয়ে চলো আরেকটা বুড়ো মিয়া খুঁজি যে আমাদের দুজনকে একসাথে নিকা করবে। নসীবন হেসে ফেলে।
ইতিমধ্যে বৃষ্টি ধরে এসেছে । বেলাও পড়ে গেছে । নসীবনের ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে । তবে বুকে কফ বলে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে । আমি ফতেমাকে ওষুধ পত্তর বুঝিয়ে দিয়ে বলি আর ভয় নেই। ঠিক হয়ে যাবে। ফতেমার মুখে হাসি ফুটে । আল্লা তোমার অনেক ভালো করুক ডাক্তার ভাবী । আমি ওকে আশ্বস্ত করে বেড়িয়ে পড়ি । বেতাল ততক্ষণে ফতেমার দেওয়া চারটে বড় বড় ফজলি আম সাবাড় করে দিয়েছে । এখন ও শান্ত ।
মাস দুয়েক পার হয়েছে । আমি ওদের কথা প্রায় ভূলেই গিয়েছিলাম । এটাই তো আমাদের দোষ। এখন বৃষ্টি নেই । সামনে দূর্গাপূজো । খুব ব্যস্ত আছি । শরতের এক ঝলমলে সকালে হঠাৎ কলিং বেল বাজতেই বেড়িয়ে দেখি .... মূর্ত্তিমান ফতেমা ও নসীবন দাঁড়িয়ে আছে । কি ব্যাপার ? আমি ওদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসাই । ফতেমা দশবার আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে খুব সঙ্কোচের সঙ্গে একটা ব্যাগ থেকে বার করে এক ডজন মুরগীর ডিম । দুটো মোচা, একটা চাল কুমড়ো, কিছু পুঁই শাক । ভাবী ! এগুলো সব আমার ঘরের । এগুলো আপনাকে নিতেই হবে । ফতেমা ধীরে ধীরে বলে । ওর চোখে এমন এক আবেদন ছিল আমি না করতে পারলাম না। ওর ইচ্ছাকে সন্মান জানাতে বললাম ঠিক আছে রেখে দাও । নসীবনকে বললাম কপাল করে সতীন পেয়েছো । ও তো তোমার জন্য কেঁদেই পাগল । এত ভালবাসে তোমাকে । নসীবন আস্তে আস্তে বলে .... ভাবী উ ক্যানে আমার প্যাটের মেয়্যা হলো না গো .... সতীন ক্যানে হলো ? তাহলে তো উ আমাকে ‘আম্মা’ ডাকতো । অর লেগেই আমি মরতে পারছি না । এই ভরা যুবতী, অকে কে দেখবে ? আমি অবাক হয়ে সতীন প্রেম দেখছিলাম ।একজন আর একজনের জন্য ভেবে মরছে ।কি ভালবাসা ? একজনের বুকে আষাঢ় তো আরেকজনের শ্রাবণ । সেদিন নসীবনের জন্য ফতেমা চোখে যে জল দেখেছিলাম, তা সেদিনের বৃষ্টির চেয়ে অনেক বেশি । আজ ফতেমার জন্য নসীবনের মমত্ব ঝরে পড়ছে সেটাও আষাঢ়ের বৃষ্টির চেয়ে অনেক বেশি । আমি বললাম কোন দরকার হলে সঙ্কোচ করো না, বলো । ফতেমা বলল ভাবী আপনি আমার ফেরেস্তা । আর আমি দেখলাম স্বর্গের দুই দেবী । আমার জন্ম সার্থক হলো ।
![]() |
| পরিচিতি |
শুক্লা সান্যাল
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:


কোন মন্তব্য নেই:
সুচিন্তিত মতামত দিন