ফাল্গুনী মুখার্জী



বিশিষ্ট গল্পকার , নাট্যকার , প্রাবন্ধিক , নাট্যাভিনেতা , পত্রিকা সম্পাদক , সমাজকর্মী , এবং বিগত চার বছর ধরে 'অন্য নিষাদ' নামক কবিতার ওয়েবজিন , 'গল্পগুচ্ছ ' নামে গল্পের ওয়েবজিন এবং নাট্যকথা' নামে নাটকের ওয়েবজিন  ব্লগার ,  বাংলা সাহিত্যের এক নীরব কর্মবীর ফাল্গুনীদা কে আত্মার সান্নিধ্যের' পক্ষ থেকে স্বাগত ।

আজকের 'একমুঠো প্রলাপে ' , আমরা গঙ্গাজলেই গঙ্গাপূজো করব ... ওনার সুবিশাল কর্মকাণ্ডের দু এক ঝলকে শব্দের মিছিলে ওনারই ভাষ্যে ...



‘অন্যনিষাদ’ এর চারবছর পূর্তিতে আপনাকে অভিনন্দন এর জনক হিসেবে । 
আজকের মুখবই জগতে এত যে ব্লগের , ওয়েব পত্রিকার রমরমা , আজ থেকে বছর চারেক আগে তো এটা ছিল না । হঠাৎ এমন চিন্তা মাথায় এলো কেন ? বেশ তো ছিলেন গল্প লেখা , সম্পাদনা , পত্রিকা প্রকাশনা , নাটক , সাহিত্যসভা আয়োজন ইত্যাদি নিয়ে ...  

বেশ গুছিয়ে প্রশ্নগুলো রেখেছো শর্মিষ্ঠা, পাকা সাংবাদিকের মত । আমাকে নিয়ে কিছুটা হোমওয়ার্কও সেরে নিয়েছো দেখছি । ‘অন্যনিষাদ’ কে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ধন্যবাদ । এই পর্যন্ত ঠিক আছে । কিন্তু আমার সাক্ষাৎকার ? এটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে অনেকের । হয়তো আমারও । যাইহোক জানতে যখন চেয়েছো, আমার মত করেই বলি ।

পত্রিকা করার শখ সেই কৈশোর থেকেই,হাতেলেখা দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে যার শুরু । ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশে (এখন ছত্তিশগড়) বিলাসপুর, রায়পুরে রেলে চাকুরি করতাম । রেল কলোনির জীবন – মেতে থাকতাম লাইব্রেরি সংগঠন, ছোট পত্রিকা আর নাটক, কবিতা আবৃত্তি নিয়ে । আর মাঝে মধ্যে ‘সত্যযুগ’ ও ‘আজকাল’ সংবাদ পত্রে ও পরিবর্তন নামে অধুনালুপ্ত একটা পাক্ষিকে আর্থ-সামাজিক ও সাহিত্য বিষয়ে পত্র-সাহিত্য চর্চা এবং এখন অস্তিত্ব নেই, কলকাতার এমন দুটি নাট্য বিষয়ক পত্রিকা – ‘অভিনয়’ ও ‘রঙ্গমঞ্চ’ পত্রিকায় লেখালেখি। সেসব লিখতাম ‘অমিতাভ মৈত্র’ এই ছদ্মনামে । ‘রঙ্গমঞ্চ’ নামের সেই পত্রিকাটির সংযুক্ত সম্পাদকও ছিলাম । ৭৫-৭৬এ নাট্যচিন্তা নামে একটা ট্যাবলয়েড নাট্যপত্র সম্পাদনা করেছি কয়েক মাস । ‘কার্টেন’ নামে একটি রাজনৈতিক-সংবাদ পাক্ষিকের প্রকাশ শুরু করেছিলাম । সম্ভবত দুটিমাত্র সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল । তখন আমি জরুরি অবস্থার কারণে কলকাতায় । ৯৪এর শেষের দিকে কলকাতায় চলে আসায় আমার প্রাণ-প্রতীম এই ব্যাপারগুলোয় ছেদ পড়লো বটে, কিন্তু এ’তো শেষ হবার নয় ! ধান ভানার জন্য ‘ঢেকি’র স্বর্গ খুজে নিতে বছর চারেক সময় লাগলো এই যা । বাসা বাঁধলাম ডানকুনিতে । আমি আসার বেশ ক’বছর আগে থেকেই ডানকুনি থেকে ‘অন্যনিষাদ’ নামে একটা মুদ্রিত সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হত, যুক্ত হয়ে গেলাম ।  ইতিমধ্যে চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে একটা কম্পিউটার কিনেছিলাম মেয়ের জন্য । যেটার মালিক হয়ে গেলাম আমি মেয়ের বিয়ের পর ২০০৭এর জানুয়ারি থেকে । কম্পিউটার আর অন্তর্জাল ঘাঁটাঘাঁটি করে কাজ চালানোর মত শিখে নিলাম । ইয়াহু, অরকুট ঘুরে ফেসবুকের কবিতা-ভুবনেও ঢুকে পড়লাম অল্পস্বল্প । নিজের চেষ্টায় নামমাত্র কারিগরি জ্ঞান নিয়ে ব্লগ তৈরী করার কায়দাটাও রপ্ত করে নিলাম । সেই সময় মাথায় একটা ভাবনা এলো । অন্যনিষাদ নামে যে মুদ্রিত সাহিত্য পত্রিকাটা বের করতাম তাকে অন্তর্জালের আন্তর্জাতিক পরিসরে জুড়ে দিলে কেমন হয় ? আধা শহর-আধা গ্রাম ডানকুনির সীমিত পরিসর থেকে এই সময়ের সাহিত্য-চর্চার বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে আসার ভাবনা কাজ করছিল । মুদ্রিত পত্রিকা থাকবে, আর তার পাশাপাশি পত্রিকারই একটা ওয়েব সংস্করণও চলতে থাকবে, ফলে নিশ্চিত ভাবেই সাহিত্য-চিন্তার আদান-প্রদানের সাথে সাথে স্বল্প সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌছান ‘অন্যনিষাদ সাহিত্য পত্রিকার’ও গ্রাহক/পাঠক সংখ্যা বাড়বে । এই ভাবনা থেকেই ‘অন্যনিষাদ’ ওয়েব পত্রিকা প্রকাশ ২০১১র ১৯শে অক্টোবর থেকে । তোমার প্রশ্নের উত্তরের বাইরেও একটা কথা বলে নেওয়া দরকার । আমার ভাবনা যাই থাক, সাহিত্য পত্রিকাটি আমার ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারলো না । তার নিজস্ব গন্ডির বাইরে এলো না । আমার সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে গেলো । চলতে থাকলো ওয়েব পত্রিকা ‘অন্যনিষাদ’ তার মত করে ।


এত প্রানশক্তি পান কোথা থেকে ? তরুণ তুর্কির গতিতে ‘অন্যনিষাদের’ মত সাপ্তাহিক ওয়েব কবিতা পত্রিকা , ‘গল্পগুচ্ছের’ মত পাক্ষিক গল্পের ওয়েব পত্রিকা , নাটকের জন্য ‘নাত্যকথা’ ইত্যাদি আলাদা আলাদা ওয়েব পত্রিকা চালাচ্ছেন , হয়তো কালেদিনে প্রবন্ধ , ভ্রমণ , রম্যরচনা , অনুবাদ সাহিত্য কিছুই ছাড়বেন না ... এই উদ্যমের রহস্যটা কি ?  


আমি সত্যিই মাঝে মাঝে ভাবি । কি করে বেরোচ্ছে এই সাপ্তাহিক কবিতা পত্র চারবছর ধরে ? নিজে জীবনে আধখানা কবিতা না লিখেও গত তিনবছরে ৩৮২জন কবির প্রায় আড়াই হাজার কবিতা পাঠকের ঠিকানায় পৌছে দিয়েছি । জানবার ইচ্ছা হয় বটে কোথায় এই প্রাণশক্তির উৎস ? এই সময়ের আমার খুব প্রিয় লেখিকা নন্দিতা ভট্টাচার্যর একটা কবিতা দুটো পংক্তি আমার খুব মনে পড়ে -

“কবিতার ঝুরি আঁকড়ে
পার করে দেওয়া যায়
একটির পর একটি দুর্বৃত্ত দিন”..।



হয়তো,কবিতার অমোঘ শক্তিই আমাকে এই কাজে জুড়ে দিয়েছে । আমি এটাকে আমার ‘কাজ’ মনে করেছি । এটা না করলে হয়তো আমাকেও সমবয়সী অনেকের মত সকাল-সন্ধ্যায় হরিসভার কীর্তনের আসরে কিংবা রেলের প্লাটফর্মে ডিয়ারনেস রিলিফের হিসাব আর পরচর্চা করেই কাটিয়ে দিতে হতো। ‘নাট্যকথা’ বেশ সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছিলাম । কিন্তু শুরু করার কথা জানানোর সময় যে বিপুল সাহচর্যের সাড়া পেয়েছিলাম, দুটো সংখ্যা বার করার পর তা আর পেলামনা । আমিও থেমে গেলাম । নাটক ভালোবাসেন, নাটক করেন অনেকেই কিন্তু তারা লেখেন না এক বর্ণও । একা আর কত লেখা যায় ? বয়সটা যদি - বেশি নয়, আর দশটা বছর কমিয়ে দেবার উপায় থাকতো তাহলে একটা চেষ্টা করে দেখতাম প্রবন্ধের একটা ব্লগ করা যায় কি না ।  এখন প্রায় চুয়াত্তর ছোঁয়া বয়সে তা আর সম্ভব নয় ।


আপনি একটি ধারাবাহিক আত্মকথাও লিখছেন । বই হিসেবে কবে হাতে আসছে পাঠকের ? কতোটা খোলামেলা আপনি তাতে ?  


‘পুরান সেই দিনের কথা’ নামে সাত পর্বের একটা লেখায় মার্চ/১৯৪২এ আমার জন্ম থেকে ৭৭এ বামফ্রন্ট সরকারের গঠন পর্যন্ত সময়কালের সঙ্গে আমার সংস্পর্শটাকে ছুয়ে গিয়েছিলাম ।  ‘আত্মকথা’ বলতে যে পারসেপসান সামনে আসে এটা সে রকম নয় । সম্ভাব্য বিতর্ক এড়িয়ে একটা বিস্তীর্ণ সময়কালকে ছুঁয়ে গিয়েছি মাত্র । না, বেশি খোলা-মেলা হতে পেরেছি বলে মনে হয় না । নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে আমার উপলব্ধি, মার্কসবাদী রাজনীতির সঙ্গে আমার সক্রিয় সংস্পর্শ, সামনে থেকে দেখা বামপন্থী শাসনের ক্রমিক ক্ষয়, এইসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছি । না বই আকারে প্রকাশ করবো এমন ভাবনা আমার নেই । খান চারেক বই করার মশলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । তাই থাক, এই বেশ আছি ।

ডানকুনি সাহিত্যআড্ডা আর আপনি ওতপ্রোত জড়িয়ে ছিলেন । আপনার ডাকে আমিও গিয়েছিলাম একবার । আপনাকে কন্যাকর্তার ভূমিকায় দেখেছি । এতদিন পর বাড়ি বদল করে কেমন আছেন ? মিস করেন সেইসব দিন ? 

ডানকুনি বইমেলা আর তাকে ঘিরে সারা বছর ধরে নানান সংস্কৃতিক আয়োজন, ওখানকার নানান সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে ওরা গত কুড়িটা বছর আমার বেঁচে থাকার – আমার প্রাণশক্তি অর্জনের প্রচুর রসদ যোগান দিয়েছে । এখনো ডাক পেলে কোন অনুষ্ঠানে যাই, দু একটা কথা বলার আমন্ত্রণ পেলে বলি । কুড়ি বছরের ঠিকানা বদল করে অন্যত্র চলে যাওয়া আমাকে বিষাদগ্রস্ত করে বৈকি । কেননা এটাতো জানি যে নতুন যায়গায় বাসা বেঁধে, এই বয়সে আর নতুন করে শেকড় ছড়ানো যাবে না । যন্ত্রণা সেটাই ।

আপনি একজন সার্থক গল্পকারও বটে । তাছাড়া প্রবন্ধতো আছেই অগুন্তি । বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সেগুলি । কিন্তু এগুলি গ্রন্থাকারে কি বেরিয়েছে ? এগুলো গুছিয়ে গাছিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেবেন না ? 


আমি ‘সার্থক গল্পকার’ এ’কথাটা মানা গেলো না । তবে লিখেছি বেশ কয়েকটা গল্প – মুদ্রিত ছোট পত্রিকায় এবং ওয়েবে । লিখেছি খান পাঁচেক নাটকও । তবে লিখেছি অজস্র গদ্য, নাট্যবিষয়ক, আর্থ-সামাজিক ও সাহিত্য বিষয়ক, জীবনীমূলক এমনকি ভ্রমণ বিষয়কও । সেগুলো বই করার ভাবনা ছিল এক সময় । এখন আর তেমন ভাবছি না বয়স আর তা ভাবতে দিচ্ছে না ।

এই যে আপনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়ান , অন্যদের লেখা গুছিয়ে ওয়েব ম্যাগাজিন  চালাতে ব্যস্ত থাকেন , সমস্ত মনিষী , স্মরণযোগ্য ব্যাক্তিত্বের ওপর প্রবন্ধ লিখে চলেন নিরন্তর মুখবইতে , আপনার কখনো মনে হয় না , সেই সময়টা বেগার নষ্ট  না করে নিজের গল্প বা অন্য লেখা লেখির পেছনে দিলে আপনি অনেক বেশি লাভবান হতে পারতেন  ? 

‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ – বেশ বলেছো । ১৫/১৬ বছর বয়স থেকে আমি এইসব করছি । আমার কখনো এমন মনে হয় নি, পরিবারের অনুমোদন ছিল বলেই । আসলে আমি যে রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করি তাতে এরকম মনে করার সুযোগ নেই । সৃষ্টির যে আনন্দ তা তো কোন শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না । আমি এই কাজগুলোকে উপভোগ করি । মাঝে মাঝে যদিও, নিশ্চিত ভাবেই মনে হয় ফেসবুক বড্ড সময় কেড়ে নিচ্ছে । আর একটু সময় পেলে দু একটা গল্প বা নাটক লেখায় মনসংযোগ করতে পারতাম ।

দুই বাংলারই বহু উদীয়মান লেখক , কবি , নাট্যকারদের আপনি ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখে আসছেন বহুদিন ধরে । আপনার কি মনে হয় এখনকার ট্রেনড সম্পর্কে ? কোনদিকে চলছে বাংলা সাহিত্য ? উজান না ভাঁটি ? 

একথা ঠিক, দুই বাংলার অনেক লেখক, কবির লেখা নিয়মিত পড়ি, পত্রিকা চালানোর সুবাদে অনেকের সঙ্গে মতবিনিময়ও হয় । ফেসবুক গ্রুপের ব্লগজিনগুলিতো আছেই, তাছাড়াও অসংখ্য ব্লগ বা ওয়েব পত্রিকা রয়েছে যেখানে গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ, প্রবন্ধ সাহিত্য, কিশো্র-সাহিত্য, রম্যরচনা ইত্যাদির বিপুল সমাবেশ ঘটে চলেছে । কবিতা তো আছেই । সাহিত্যের এই বিপুল আয়োজনকে ভাটির টান বলবে কে ? সত্য বটে, সংখ্যাগত পরিমান শেষ কথা বলে না । সেইসব লেখা – গল্প-উপন্যাস- কবিতা, পাঠককে কতটা রিলেট করতে পারছে, কতটা ‘সময়ের শব্দ’ শোনাতে পারছে, সেটা একটা জরুরি প্রশ্ন । তবে কিছুই হচ্ছেনা বলে উন্নাসিকতা বা হতাশা প্রকাশে রাজি নই । যে বিপুল সংখ্যক কবি, গল্পকার উঠে আসছেন তার গুরুত্ব তো অসীম ।

দুইবাংলার লেখালেখির ধরণের মধ্যে মিল আর অমিল কি কি আপনার মতে ?


সাহিত্যের কোন এপার-ওপার ভেদরেখা টানা যায় বলে আমি মনে করিনা । দু’ দেশের মানুষইতো একই জাতিসত্তার অংশ । একটা গল্প বা কবিতা পড়ার সময় আমার কখনোই মনে হয়না এটা বাংলাদেশের কোন লেখকের লেখা কিংবা এপারের। গুণগত পার্থক্য করা যায়না, বিষয় গত পার্থক্য থাকতে পারে । সাহিত্যে সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন ঘটে । এপারের সমকালীন বিষয় ভিত্তিক একটা গল্পের সঙ্গে ওপারের কোন সব হারানো মানুষের বেদনা নিয়ে একটা গল্প নিশ্চই পৃথক,গল্পের প্রেক্ষাপট বিচারে । কিন্তু গল্পের সাহিত্যগুন বা পাঠকের ‘ইনভলভমেন্ট’ এর ক্ষেত্রে তো কোন পার্থক্য থাকেনা । একই সাহিত্য সম্পদের অংশীদারতো দুই বাংলাই । তবে একথা প্রসঙ্গত বলতে হয় যে, দুই বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্খার ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য আছে । বাংলা ভাষা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে – এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা । বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে ওপার বাংলার আবেগ, ভালোবাসা এপারের চেয়ে অনেক বেশি বলেই আমার ধারণা । কিন্তু গুণগত মান এপারের সঙ্গে সমান ভাবে তুলনীয় নাও হতে পারে, কারণ মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স মাত্র চল্লিশ বছর । ১৯৪৭ পরবর্তী সময়কালে এপারের বাংলা সাহিত্য যেভাবে সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পেয়েছে, ওপারের সাহিত্য তা পায়নি কারণ দেশ বিভাগের প্রথম দিন থেকেই তাকে লড়াই করতে হয়েছে ভাষাগত সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে – নিজ মাতৃভাষার মর্যাদার দাবীতে । অর্থাৎ সাহিত্যের পূণর্গঠনের যে কাজ এপার করতে পেরেছে ওপারের পক্ষে তা সম্ভব ছিলনা । সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুটি দশক তো বড় কম নয় ! আর একটা বিষয় উল্লেখ করবো । সমাজতান্ত্রিক চেতনা এপারের বাংলা সাহিত্যকে যতটা সমৃদ্ধ করেছে ঐতিহাসিক কারণেই ওপারের সাহিত্যে তা হয়নি । ১৯৫০ পরবর্তী সময়কালে এপার বাংলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তরঙ্গ তীব্রতর হয়েছিল যার অনিবার্য প্রভাব পড়েছিল সাহিত্যে । ৪৭ থেকে একাত্তর পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ বা ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হয়নি । সুতরাং পার্থক্য যদি কিছু থাকে তা এই ঐতিহাসিক পৃষ্ঠভূমির কারণে ।

কেমন বুঝছেন ওয়েব ম্যাগাজিন এর ভবিষ্যৎ ? কি মনে হয় , লিটিল ম্যাগাজিনের জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিতে পারবে এটি ? বিভিন্ন সময়ে যেমন বিভিন্ন গোষ্ঠীর লিটিল ম্যাগ আন্দোলন হয়েছে , সেরকম কিছু কি এই  ওয়েব ম্যাগের দুনিয়ায় সম্ভব ? 

ধরো, মাউস ক্লিক করে সবকটা সংবাদপত্র পড়ে নেওয়া যায় । তা বলে কি বাড়িতে সংবাদপত্র রাখা বন্ধ করেছি ? করা সম্ভব ? ক’বছর আগে মাইক্রোসফট গুরু বিল গেটস বলেছিলেন দম্ভ ভরে যে মুদ্রিত বইএর যুগ শেষ করে দেবেন । গ্রন্থাগারের আর দরকার হবে না । এইসব কথা অর্বাচীন মনে হয় না ? ওয়েব ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন সংশয়ের অবকাশ আছে বলে আমার মনে হয় না । ওয়েব পত্রিকা অনেক বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌছায়, প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে স্বল্প ব্যয় বা বিনা ব্যয়ের ওয়েব পত্রিকার চাকচিক্য বেশি থাকে সত্য, কিন্তু মুদ্রিত লিটল ম্যাগাজিনকে বিপন্ন করে তোলার ক্ষমতা এর নেই । ওয়েব পত্রিকায় রয়েছে তাৎক্ষণিকতা ও চটজলদি ব্যাপার, আর মুদ্রিত লিটল ম্যাগাজিনে রয়েছে সৃষ্টির স্থায়ী তৃপ্তি । আমি ওয়েব পত্রিকাকে মুদ্রিত পত্রিকার পরিপূরক হিসাবে দেখি, যা নাকি আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য-প্রয়াসের অনিবার্য আধুনিকতম সংযোজন । জামসেদপুরের কাজল সেন তো বেশ চালাচ্ছে গত ৩৫বছর ধরে মুদ্রিত ‘কালিমাটি’ পত্রিকা আর গত দুবছর ধরে ‘কালিমাটি অন লাইন’ওয়েব পত্রিকা । কিন্তু ‘আন্দোলন’ কথাটায় যে ধারণা সেই রকম লিটল ম্যাগ আন্দোলনের কোন সংকেত আমি অন্তত দেখছি না । কারণ শূন্যতা বোধে আক্রান্ত এই সময়ে আমাদের নাড়িয়ে দেবার মত কোন আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলল দেখছেনকি কেউ, যার অনিবার্য প্রভাব সেই সমাজের শিল্প সাহিত্যে পড়ার কথা ? বরং আমি মনে করি ওয়েবে সেই সম্ভাবনা অনেক বেশি সেখানে তারুণ্যের নির্ভিক উপস্থিতির জন্য । ওপারে সহবাগ আন্দোলন, দিল্লীর নির্ভয়া কান্ড এবং অতি সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু স্ফুলিঙ্গ আমরা দেখেছি ।

আপনি তো একটি বর্ণময় কর্মজীবন কাটিয়েছেন , ভারতীয় রেলে , ফ্রিলান্স সাংবাদিক হিসেবে , বা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে । ভ্রমণও হয়েছে প্রচুর । সেসব কিভাবে প্রভাব ফেলেছে আপনার চিন্তা বা পরিকল্পনায় ? আপনার গল্পের চরিত্ররা কতটা প্রভাবিত হয়েছে তার দ্বারা ? 

বর্ণময় কর্মজীবন ? হ্যাঁ, তা বলতে পারো । ৩৮বছর চাকরি করেছি ।,তার ৩২টা বছরই বাইরে ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর ও রায়পুরে । বর্ণময় বলতে ঐ বত্রিশটা বছর । আর চুরানব্বইএ অবসর নেওয়ার পরের কুড়ি বছরটা ।   কলকাতার ছ বছরের চাকরি জীবনটা বরং অনেক বিবর্ণ । কলকাতা  আমার খুব পছন্দের যায়গাও নয় । ঐ বত্রিশটা বছর সত্যিই বর্ণময় ছিল । চুটিয়ে নাটক, আবৃত্তি করেছি, দুর্গাপূজায় মার্কসবাদী সাহিত্যের দোকান চালিয়েছি, ট্রেড ইউনিয়ন করেছি, ঐ সময়কালে যেকটা রেলকর্মী আন্দোলন হয়েছে সবকটায় সক্রিয় অংশ নিয়েছি আর সেই সুবাদে বাইশদিনের জেলযাপন, চাকুরি থেকে ছাঁটাই, জরুরী অবস্থায় এলাকা থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করে থাকা, তিনবছর পরে পুরো বেতনসহ চাকুরি ফিরে পাওয়া সবই হয়েছে ঐ সময়কালে । এবং এগুলোই আমার বাকি জীবনের ফুসফুসের সঞ্চিত বাতাস – এখনও । বর্ণময় জীবনই বটে ।

আপনার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মতবাদ আছে । সেটা কি কখনো আপনার  সাহিত্য জগতের প্রসারে অন্তরায় হয়েছে ? কি মনে হয় , রাজনীতি থেকে গা বাঁচিয়ে সাহিত্য চর্চা জরুরি ? 


আমি একথা জানাতে মোটেই কুন্ঠিত নই যে আমি মার্কসবাদী জীবনদর্শনে বিশ্বাসী ও আস্থাশীল এবং সেই কৈশোর থেকেই জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে চলেছে সেই জীবনদর্শন । না, রাজনৈতিক বিশ্বাস আর সাহিত্যে দলীয় রাজনীতির প্রতিফলন এক ব্যাপার নয় । প্রশ্ন হল তোমার সাহিত্য মানুষের পক্ষে, তার অগ্রগতির পক্ষে কি না, সে সাহিত্য জীবনের পক্ষে কি না । তাই আমি বিশ্বাস করি  সাহিত্য ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ’ হতে পারে না । জাঁ পল সার্ত্রের একটা কথা উদ্ধার করি । বলেছিলেন “তুমি যে ভাবেই শিল্পী হয়ে থাকোনা কেন, আর যে মতই প্রকাশ করে থাকোনা কেন, সাহিত্য তোমাকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিলে ফেলবেই”।

আপনি তো জরুরি অবস্থা দেখেছেন , যদি সেই বিষয়ে আপনার বিশেষ কোন অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলেন আমাদের ... 



১৯৭৫এর ২৬শে জুন জারি হয়েছিল আভ্যন্তরীন জরুরি অবস্থা । কেন্দ্রে তখন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধির কংগ্রেসী সরকার । ১৯৭৫ এর ২৫শে জানুয়ারি থেকে সাতাত্তর আমার কাছে ছিল স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে অনুজ্বল, সবচেয়ে মসিকৃষ্ণ সময়কাল । সেই দিনগুলিতে আমার অভিজ্ঞতা খুব ছোট করে বললেও পত্রিকার পৃষ্ঠার অনেকটা যায়গা নিয়ে নেবে । তবু যেটুকু না বললেই নয় সেটুকু বলি । দিনটা ছিল ২৭শে জুন ১৯৭৫ । কারো মুখ থেকে শুনলাম আগের দিন গভীর রাতে নাকি ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়েছে । আমল দিইনি, হয়েছে তো হয়েছে, ১৯৬২তে চিন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের সময়ওতো ইমার্জেন্সি জারি করা হয়েছিল শুনেছি । ভেবেছিলাম সেইরকমই কিছু হবে । তখন চুয়াত্তরের রেল ধর্মঘটের সুবাদে চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে আছি । চাকরী না থাকলেও প্রতি দিনের মত সেদিনও অফিসের ক্যানটিনে আমাদের চাকরীহীন কয়েকজনের চাএর আড্ডা চলছিল । আর্থার হাইড নামে একজন নামি হকি খেলোয়াড় ছিল । গুন্ডামি করতো, জুয়ার তোলাবাজি করতো, কিন্তু আমাদের খুব ভালোবাসতো । হাইডকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল । ওখান থেকেই ওর কোন চেলাকে দিয়ে আমাদের খবর পাঠিয়েছিল ‘ভাগো, ‘মিসা’ যা রহা হায়’ ইতিমধ্যে খবরের কাগজে আগের দিন রাত্রে লোকসভার প্রায় সব বিরোধী নেতাদের গ্রেফতারের খবর জেনেছি । ‘মিসা’ বা ‘মেইনটেন্যান্স অফ ইনটারনাল সিকিউরিটি এক্ট’এর মহিমার কথাও জেনে গিয়েছিলাম । আমরা তিনজন ছিলাম ‘হিট লিষ্ট’এ। যে যার ছিটকে গেলাম ।

নিজের কোয়ার্টারেতো থাকা যাবে না, এক সহকর্মীর কোয়ার্টারে একটা ঘরে বাইরে থেকে তালাবন্ধ অবস্থায় থাকলাম দুটোদিন । কলোনির শুকনো রাস্তায় ধুলো ওড়ানো পুলিশ জীপের হন্যেদৌড় । আমার নিজের কোয়ার্টারে পুলিশ পরোয়ানা সেঁটে দিয়েছিল আর অফিসে জানিয়ে দিয়েছিল ‘সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হ’ল’ বলে । তখন আমার সম্পত্তি বলতে ছিল তো প্রভিডেন্ড ফান্ডে পড়ে থাকা শ’ আড়াই টাকা ! পরে সেই পরোয়ানার কপি আদালত থেকে তুলেছিলাম, লেখাছিল ‘দেশ বিরোধী নাটক করি, আর রেলওয়ে মার্কেটটা নাকি জ্বালিয়ে দেবার ছক কষেছিলাম’ । বোঝ কান্ড ! সেই পরোয়ানার কপিটা এখনো আমার কাছে আছে ।

বন্ধুরা বাইরে বিকল্প রাস্তা খুজছিলেন আমাদের পালানোর ব্যবস্থা করার । পরদিন দুপুরে লুঙ্গি পরে মাথায় একটা গামছা জড়িয়ে গ্রামীণ রাস্তা ধরে টাঙ্গা করে একটু দূরের একটা স্টেশন থেকে একটা মালগাড়িতে গার্ডের সঙ্গে টাটানগর পৌছালাম । সেখান থেকে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে কলকাতা । কলকাতাতো এলাম থাকবো কোথায় ? নিজের বাড়ি যাওয়া চলবে না । বন্ধুরা খিদিরপুরের একটা মেস’এ একবন্ধুর অতিথি হয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করল । খাওয়া, বাবু বাজারের একটা হোটেলে । খিদিরপুরের মেস’এ নানা সন্দেহের চোখ, কোথায় থাকতাম, এখানে থাকছি কেন এই সব । তিনদিন পরে অন্য ব্যবস্থা হল বেহালায় ইস্টার্ণ রেলের চাকরি যাওয়া এক সহকর্মীর নির্মীয়মান বাড়ির একটা ঘরে শোয়া আর অন্য এক (এখন প্রয়াত) বন্ধুর বাড়িতে খাওয়া । সে তখন চাকরি হারিয়ে ফুটপাথে জামা কাপড় বিক্রি করতো । ফাঁকা বাড়িতে একাএকা থাকা নিরাপদ ছিল না । পরের দিন থেকে বন্ধুর বাড়িতেই থাকারও ব্যবস্থা হ’ল । রোজ বিকালে কার্জন পার্কে এসে মিলতাম । রোজই কেউনা কেউ বিলাসপুর থেকে আসত । দেখা হ’ত, খবরের আদান-প্রদান হ’ত । দিনপনেরো এইভাবে চললো । জানতে পারলাম মধ্য প্রদেশের ‘মিসা’ কলকাতায় প্রযোজ্য নয় । আড়িয়াদহে বাড়ি ফিরে গেলাম । ১৯৭৭এর ২১শে মার্চ জরুরী অবস্থা প্রত্যাহৃত হ’ল । ১৬ থেকে ২০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনের হ’ল । কেন্দ্রে জাতীয় কংগ্রেসের একদলীয় শাসনের অবসান হ’ল । মোরারজি দেশাইএর নেতৃত্বে জনতা পার্টির সরকার গঠিত হ’ল ২৪শে মার্চ । রেলমন্ত্রী হলেন মধু দন্ডবতে । রেলমন্ত্রী হয়ে প্রথম যে সরকারী কাগজে সই করেছিলেন তিনি, সেটি ছিল ভারতের সমস্ত বরখাস্ত ধর্মঘটী রেলকর্মীদের চাকুরিতে পুণর্বহালের এর আদেশনামা । কর্মস্থলে ফিরে গেলাম । জরুরি অবস্থার সময় একবার গরিফায় নাটক করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলাম, নাটক বন্ধ করে দিয়েছিল স্থানীয় মস্তান বাহিনী । আর একবার একটা ছোট পত্রিকার জন্য সুকান্ত ভট্টাচার্যের ওপর আমার একটা নির্বিষ লেখা পুলিস বা সেন্সর কর্তারা আটকে দিয়েছিল ।


এখনকার নতুন সাহিত্যিকদের মোটিভেট করার উদ্দেশ্যে যদি দুটি বাক্য বলতে বলা হয় আপনাকে , কি বলবেন ? 



না না, নতুন বা পুরাতন কাউকে মোটিভেট করার মত কেউকেটা আমি নয় । এখনকার নবীন প্রজন্ম অনেক বেশি মেধা সম্পন্ন । তবু যদি কেউ শুবতে চায় তাদের জন্য উচ্চারণ করবো পাবলো নেরুদার একটি কবিতার পংক্তি –

‘আর কিছু নয়
সত্যের সাথে আমার চুক্তি
এ পৃথিবীর জন্য সঞ্চয় করবো আলো’  এমনই হোক নবীন প্রজন্মের অন্বিষ্ট  ।

আপনার ব্লগার জীবনে আপনি শ্রদ্ধা ভালবাসা তো পেয়েছেন অগুন্তি , আপনি ইউনিভার্সাল ‘ফাল্গুনি দা’ ... সেই আপনারও আছে কি এমন কোন তিক্ততা যা ভুলতে পারেন না ? 


আমি ‘ইউনিভার্শাল ফাল্গুনী দা’ । অনেকের কাছে আবার ‘ফাল্গুনী জেঠু’ও । আপ্লুত শব্দটা অতি ব্যবহারে এখন ক্লিসে হয়ে গেছে । কিই যে বলি ! অবাক হয়ে যাই  । কিকরে যে পাই এমন উজাড়করা ভালোবাসা ! এতো ভালোবাসা পাওয়ার পর কোন তিক্ততার সাধ্য কি যে মনে বাসা বাঁধে ?

আপনি সক্রিয় ভাবে নাটক করছেন কি ইদানিং ? কিছু পরিকল্পনা আছে এ বিষয়ে ? 



নাটকে অভিনয় আর ইদানিং তেমন করতে পারি না । আর বাসা বদলের জন্য কোন নাটকের দলের সঙ্গেও যুক্ত নয় আর । ডানকুনিতে থাকাকালীন শেষ অভিনয় করেছিলাম গত বছরে । আর গত মার্চে নটী বিনোদিনীর জীবন নিয়ে আমার লেখা একটা নাটক ‘বিনোদ কথা’ ডানকুনির একটি নাট্যগোষ্ঠী কলকাতার শিশির মঞ্চে  অভিনয় করেছিল । আর গত বছর গোটা পাঁচেক নাট্যবিষয়ক সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম । ব্যস আমার সাম্প্রতিক নাট্য-সংস্পর্শ এটুকুই ।

এই আত্মপ্রচার আর আত্মসর্বস্বতার যুগে এই যে আপনারা অল্প পরিচিত সাহিত্য কর্মীদের একটা প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছেন , তুলনায় প্রতিষ্ঠিতদের পাশাপাশি সুযোগ করে দিচ্ছেন , কালেদিনে তারাও বিখ্যাত হয়ে উঠছে । আপনি কি মনে করেন না এটাও একধরনের সমাজসেবা ? দিলেন তো অনেক , দ্যান তো অনেক , ফেরত পান কি যথাযথ ? 

এইটা আমার একটা গর্বের যায়গা । লক্ষ্য করেছো অবশ্যই যে অন্যনিষাদের প্রতি সংখ্যাতেই নতুন যারা লিখছেন তেমন কিছু, তুলনায় অপরিণত লেখাও প্রকাশ করি । তোমাদের মত প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি তাদের লেখা যায়গা করে নেওয়ায় তাদের উজ্বল খুশি মুখ আমি দেখতে পাই । এমনও হয়েছে জীবনের প্রথম কবিতাটাই পাঠিয়ে দিয়েছে, একটু মেরামত করে, তাকে দেখিয়ে প্রকাশ করে দিয়েছি । আবার  স্পষ্ট করে বলেন নি কোনদিন, কিন্তু আমি বুঝি, কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত কবির প্রবল অনীহা অপরিণত নবীন কবিদের সঙ্গে একাসনে বসার । আবার আনন্দ হয়, যখন কোন কবিবন্ধু বলেন ‘অন্যনিষাদ নবীন কবিদের কবিতার গর্ভগৃহ’ । আসলে আমি এটাকে আমার একটা ‘কাজ’ মনে করি । মনে করি আমার জন্য নবীন কোন কবির নিজের প্রতি একটু বিশ্বাস যদি জন্মায়, ক্ষতি কি ? জিজ্ঞাসা করেছো, দিয়েছি অনেক, ফেরত পেয়েছি কিছু ? কতটুকু দিয়েছি বা দিয়ে চলেছি কিংবা আদৌ তাকে ‘দেওয়া’ বলা যায় কি না আমার জানা নেই । কিন্তু ফেরত পেয়েছি অনেক – প্রাপ্যের চেয়েও বেশি । নাহলে এই ‘ভার্চুয়াল দুনিয়ায়’ আমার মত একটা তেড়া-বাঁকা উটকো লোকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার মত‘পাগলে’র দেখা মেলে ?

আপনার পরিবার সম্পর্কে যদি একটু আলোকপাত করেন ... কিভাবে সম্পৃক্ত হলেন সাহিত্য জগতের সাথে ? কোন পারিবারিক বা পারিপার্শ্বিক প্রভাব ছিল কি ? কাদের লেখায় অনুপ্রাণিত বোধ করেন , যদি একটু বলেন ... 


আমার পারিবারিক কথা ? বড্ড ব্যক্তিগত হয়ে যাবে যে  । না বলাই ভালো । তবে কিছুতো বলতেই হবে । তখন চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে জরুরি অবস্থায় ‘মিসা’য় গ্রেপ্তারি এড়াতে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে এসেছি । ৭১এ আমার চেয়ে তিনবছর তফাতের ছোট ভাই হাজারিবাগ সেন্ট্রাল জেলে আরো ১৫জন বন্দির সঙ্গে পুলিসের গুলিতে অথবা লাঠিপেটায় নিহত হয়েছে । মা নানান বিপর্যয়ে দৃষ্টি শক্তিহীন । আমাদের থাকার মাটির বাড়িটাও দেনার দায়ে বিক্রি হয়ে গেছে, আমরা একটা ভাড়া বাসায় চলে গেছি । এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় আমারই পাড়ার এক পরিবার তাদের মেয়ের সঙ্গে আমার বিবাহের  স্বপ্ন কেন দেখেছিল কে জানে । সাতাত্তরে চাকরি ফিরে পাবার পর ৭৮এ বিয়েটা হয়ে যায় । বাবা ছিলেন সামান্য বেতনের স্কুল শিক্ষক । কৈশোর থেকেই বামপন্থী আন্দোলেনর কর্মী ছিলা্ম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উতাপ অনুভব করেছিলাম সেই কৈশোরেই । আর কে না জানে যে গত শতাব্দীর চল্লিশ থেকে ষাটের দশকটা ছিল বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ ।

বাংলা অ্যাকাডেমিতে ওয়েব ম্যাগাজিন নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল কিছুদিন আগে ... সেখানে আপনিও বক্তব্য রেখেছিলেন বলে জানি ... মূলত কি নিয়ে আলোচনা হল সেখানে ? সমস্ত ব্লগাররা কি কোনোভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ রেখে এগোনোর কথা ভাবলেন ? 

গত বছরের আগস্ট মাসে ওয়েব পত্রিকাগুলির মধ্যে একটা সমন্বয় আনার প্রয়াসে ব্লগারদের একটা মত-বিনিময় সভা হয়েছিল বাংলা আকাডেমিতে । অনেকগুলি ওয়েব পত্রিকা সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন, তাদের প্রয়াসকে তুলে ধরেছিলেন । অন্যনিষাদ ও গল্পগুচ্ছও যোগ্য মর্যাদা পেয়েছিল তার কথা বলার । খুব অভিনব প্রয়াস মনে হয়েছিল আমার । কিন্তু ব্লগগুলির মধ্যে কোন সমন্বয় আনা যায় কি না, বা কিভাবে যায় সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট দিশা পাওয়া যায় নি । কিন্তু একটা সম্ভাবনা ছিল । আসলে উদ্যোগীরা কোন ফলোআপ করলেন না আর ।

বহিরঙ্গে তো এক পূর্ণ মানুষ তৃপ্ত মানুষ দেখি আপনাকে ... আছে কি কোন আক্ষেপ যার জন্য পুনর্জন্ম পেলে ভালো হয় ? 


হ্যাঁ, আমি খুব তৃপ্ত মানুষ । পূনর্জন্ম টন্ম তো কোন কাজের কথা নয় । তবে আক্ষেপও একটা আছে । তা হ’ল, আমার মনের বয়সের চেয়ে দেহের বয়সটা যেন তাড়াতাড়ি বেড়ে গেল ! বছর কুড়ি কম হলে বেশ হত ।

সাহিত্যে শ্লীল অশ্লীল প্রসঙ্গে অনেক সময় আপনাকে বিবাদে জড়িয়ে পড়তে দেখেছি । আপনি কি ভাষায় বা প্রকাশভঙ্গিতে কোন সাহিত্যিক শুদ্ধতা থাকা দরকার বলে মনে করেন ? এটা কি বিশ্বাস না কি  জেনারেশান গ্যাপ ?   

 সাহিত্যে ভাষার শুদ্ধতা থাকা দরকার বলেই আমি মনে করি । এও মনে করি, শিল্প-সাহিত্য সমাজের ‘ফোটোগ্রাকিক রিপ্রেসেন্টেশন’ নয় । এ আমার আজন্ম লালিত বিশ্বাস । যা আমার সুস্থ রুচিবোধকে আহত করে তাই অশ্লীল ।

আপনাকে যদি একটা দশ জনের তালিকা করে দিতে বলি এই বাংলার প্রমিসিং কবি ও গদ্যকারের , আপনি কি ঝুঁকিটা নেবেন ? দেখেন তো অনেককেই খুব কাছ থেকে ...  


কঠিন, খুব কঠিন কাজ । ‘অন্যনিষাদ’এ গত তিনবছরে ৩৮৫জন কবির আড়াই হাজার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে, গল্পগুচ্ছ’তে প্রকাশিত গল্পের সংখ্যাও প্রায় সাড়া তিনশ’। সবগুলো পড়েছি । তাছাড়া ফেসবুকের নানার গ্রুপে, ওয়েব পত্রিকাগুলিতে অজস্র কবিতা প্রতি নিয়ত পড়ছি । এই বিপুল সংখ্যার মধ্য থেকে দশজনকে কি বেছে নেওয়া যায় ? ‘অন্যনিষাদ’ ও ‘গল্পগুচ্ছ’তে যারা লেখা দেন না বা  দিতে চান না কিন্তু খুব ভালো লেখেন, তাঁদের লেখাও নিয়মিত পড়ি নানান গ্রুপে ও ওয়েব পত্রিকায়, ভালো লাগে । আমার মুখ দিয়ে উচ্চারণ নাই বা করালে ।


আপনার ‘কথা কোলকাতা’ এই ধারাবাহিকটি বেশ ঐতিহাসিক তথ্যসম্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল ... এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যাপারে কোন উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে ?


১৮ ও ১৯ শতকের বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্য আমার আগ্রহের বিশেষ যায়গা । আমার জানার আগ্রহ ও বই ঘাঁটাঘাঁটির সিংহ ভাগই জুড়ে আছে ১৮ ও ১৯শতকে বাংলার সমাজ ও সাহিত্য । ইতিহাস ও বইপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্য ঘেঁটে ‘নগর কলকাতা’র বিবর্তনের কিছু কথা লিখে রেখেছি । সংগৃহীত তথ্যগুলিকে ভিত্তি করে লিখেছি একটি ওয়েব পত্রিকায় দুটি লেখা ‘কলকাতার শৈশব’ ও ‘কলকাতার তারুণ্য’, দুটি মুদ্রিত পত্রিকায় লিখেছি ‘কলকাতার ছেলেবেলা’ ও ‘আদি কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা’ । হাতে নিয়েছি আরো দুটি বিষয়ে লেখা ‘কলকাতার অপরাধ জগতের বেড়ে ওঠা’ ও  কলকাতার বারাঙ্গণাদের উদ্ভবের কথা । কলকাতার থিয়েটারের পত্তন ও বিবর্তন’ নিয়েও কয়েকটি লেখা নানান ছোট পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে । এগুলিকে একত্রিত করে একটা বই করতে পারলে বেশ হ’ত, কিন্তু তা আর হবার নয় । আপাতত তাই ফেসবুকে বা প্রিন্ট পত্রিকায় শ’দুয়েক পাঠকের কাছে আমার লেখা পৌছালেই আমি খুশি ।

আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন ? ভাগ্যে ? নাকি মানুষই শেষ কথা ? আর উদ্যম ? আপনি ব্লগার হিসেবে নিজেকে দশে কত দেবেন ?   


ভাগ্য বা ঐশ্বরিক শক্তিতে আমার বিশ্বাস নেই কিন্তু । প্রবল বিশ্বাস আছে ইচ্ছা শক্তিতে । আর ব্লগার হিসাবে নম্বর ? হাসির শব্দ অক্ষর দিয়ে লেখা যায়না যে। 

ধন্যবাদ ফাল্গুনি দা , আপনার কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের জন্য দু দণ্ড ব্যয় করার জন্য । পরম মঙ্গলময়ের কাছে আপনার সুস্থ সবল আনন্দময় শান্তিপূর্ণ সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল প্রার্থনা করি , আপনি যেভাবে নীরবে বঙ্গ সাহিত্যের সেবা করে চলেছেন , তা সত্যি অনুপ্রেরণা যোগায় আমাদের। বিনয় আপনার ভূষণ , কর্ম আপনার দেবতা , আপনি নমস্য এবং মনে হয় , আপনার মত মানুষের কথা আরও বেশি করে জানা দরকার আমাদের ... আমরা মই বেঁয়ে উঠে পেছনটাকে দুবার ফিরে দ্যাখার কথা ভাবি না অনেক সময় , তাদের কাছেও আপনার মত নীরব সাহিত্য কর্মীর গুরুত্ব অনস্বীকার্য । আপনাকে আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কাজ করে চলুন আপনি , আমরা অবাক হয়ে দেখি , শিখি , উদবুদ্ধ হই ... 


~ সঞ্চালক  ~ 


ফাল্গুনী মুখার্জী ফাল্গুনী মুখার্জী Reviewed by Pd on অক্টোবর ২৩, ২০১৪ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

banner image
Blogger দ্বারা পরিচালিত.