কবিতার সাইন্স, আর্টস, ও কমার্স নিয়ে কিছু বলার ছিল যে!
অমিতাভ দাশ
কলকাতা ।
আমি বিশ্বাস করি, কবিতার উৎস, গতি ও পরিণতি তীব্রতায়...কবিতার ও কবির দায়বদ্ধতাও তাই তীব্রতার কাছে ! তীব্রতা অর্থে গতানুগতিকএর জলস্রোত অনেক অনেক ছাপিয়ে এক একটি ঢেউ, অর্থাৎ Vibration বা কম্পন, যা কবিকে আবদ্ধ করে প্রথমে এবং তারপর বাধ্য করে লিখতে কবিতাটি এবং পরে পাঠককে সংক্রামিত করে, তারও মনে দোলা জাগায়, এবং এরকম ভাবে দোলা দিতেই থাকে ও অণুরণন জাগায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকদের। এইভাবে কয়েক যুগ বা এমনকি শতক পেরিয়ে শুদ্ধ ও মহৎ কবিতারা "বেঁচে থাকে" আর আমাদেরও "বাঁচিয়ে রাখে"।
"বাঁচিয়ে রাখে" এই অর্থে...যে আমরা, প্রতিটি মানুষ-ও, একটি complex vibration...নানা রকম স্পন্দন, আবেগ, উপলব্ধি ও চেতনায় ঢেউএর দোলা যখন আমাদেরকে প্রবল দোলায়...তখনই তো মনে হয় "হ্যাঁ...বেঁচে আছি"!
একটি চেয়ার বা একটি টেবিলও কিন্তু কম্পন, কারণ পারমাণবিক ও ক্ষুদ্রতর বিভাজনের জগতে...সবই কম্পন! ইলেকট্রনেরা দুলে বেড়াচ্ছে! তাই চেয়ার-টেবিল-এরও একটি চেতনার বলয় রয়েছে...শ্রী-অরবিন্দ যাকে define করেছেন Inconscience বলে...কিন্তু সেই "চেতনায়"...এবং...যাঁরা কবিতা পড়তে এখনও আগ্রহী হয়ে ওঠেন নি, তাঁদের চেতনাতেও... কবিতা-ঢেউ দোলা দেয় না!
কবিতার সাইন্স ও আর্টস, অর্থাৎ সৃজন, উপলব্ধি, বিস্তার ও প্রভাব...মানুষের মনে...একটি vibration এর খেলা ও লীলা
ও তারপর আমাদের কম্পমান সত্তায় তার রূপান্তর, বিস্তার ও প্রভাব...এই বিষয় নিয়ে আরো অনেক বিশদ আলোচনা ভবিষ্যতে করার ইচ্ছে রইল...এইটুকু শুধু বলে যাই যে কবিতা আমাদের দুটি জিনিস উপহার দেয় ও শেখায়, 1) প্রথমত এই শুদ্ধ তীব্র কম্পন, চেতনার স্পন্দনকে উপলব্ধি ও আত্মনিহিত করতে শেখা এবং তারপরে আরও তীব্রতর গভীরতর কিছুর অণ্বেষণ নিজে থেকেই সত্তাকে অধিকার করে নেয়...অর্থাৎ জীবন যদি মনুষ্য চেতনার আরোহন ও বিবর্তন হয়, কবিতা সেই যাপনে অন্যতম ভূমিকা নিয়ে নেয়, আর 2) সবচাইতে বড়ো উপহার ও শিক্ষা হলো কবিতা আমাদের উপলব্ধি ও বোঝার ওপারের অনাবিস্কৃত অনামী জগতে যেতে শেখায়, কারণ এমন অনেক কবিতা আমরা পড়ি, সবটা বুঝি না, কিন্তু একটা অজানা কোন কম্পনে সত্তা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে...এবং আমরা এইভাবেই শিখি অচেনাকে চিনে চিনে জীবন ভরাতে! উপলব্ধির ওপারে এভাবেই কবিতার আত্মা আমাদের আত্মার সাথে যোগাযোগ ঘটায়, আমরা অভ্যস্ত হই দীক্ষিত হতে, আত্মসমর্পনে...
অতএব, কবিতা পড়া, খুউবই জরুরী...বিশেষ করে আমাদের বাংলা ভাষাটি যেখানে এত সমৃদ্ধ! কিন্তু কিভাবে ছড়ানো যায় এই বারতা, কিভাবে, যেখানে "পড়া" ব্যাপারটাই হারিয়ে যাচ্ছে! বিজ্ঞাপনএর ঠেলায় সীমিত হচ্ছে মনযোগের পরিসীমা!
আমরা তো কেউই চেতনায় আকাট, মানে কাঠ, মানে চেয়ার-টেবিল হয়ে থাকতে চাইনা, মানে মনুষ্য-চেতনার যে ন-টা স্তর শ্রী-অরবিন্দ define করেছেন, তার নীচের দিকে...খেয়ে পড়ে, বাচ্চা উৎপাদন ও তাদের "রেখেছো (pseudo)-বাঙালী করে মানুষ করোনি'...এসবেই দিব্যি জীবনটা কাটিয়ে দেবো, এরকম কি কেউ চান? নাহ্ তা নয় বলেই আজ "আত্মার সান্নিধ্যে যারা"... বা আরো কবিতার গ্রুপ-এ, ব্লগ-এ, বা লিটল ম্যাগাজিনে, খুঁজে চলেছি কবিতা, বুভুক্ষু এই আমরা, এবং লিখেও চলেছি!
সংক্রামিত একটা চর্চা চলছে, আর বিশেষ করে internet o Facebook কবিতা-চর্চাকে আজ একটা "viral property" দিয়েছে, তাৎক্ষণিক প্রকাশ এর সুযোগ, নিমেষে দূর থেকে দূরে এবং একটি মানুষ থেকে আর একটি মানুষে ছড়িয়ে যাচ্ছে, কবিতা প্রতি মুহূর্তে, আলোর গতিতে!
কিন্তু তাও প্রয়োজন থেকে যায়...বই পড়ার, বইএ গ্রন্থিত করে রাখা সংকলন, একক কবির বা নানা কবির একত্র, Printed Media র এখনো কোন সেরকম জনপ্রিয় ও আয়ত্বাধীন বিকল্প নেই...অতএব বই নির্মাণের একটা প্রয়োজন দেখি...এবং এইখানে কবিরা কাঁদিয়া থাকেন, কারণ এইরকম সব কথাবার্তা শোনা যায়, শুনেছি প্রচুর: a) পয়সার অভাব, b) প্রকাশক কবিতার বই নির্মাণ করতে চান না, কারণ কবিতার বই বিক্রি হয় না, c) এমনকি কবি নিজের পয়সায় তৈরী করতে চাইলেও করানো মুশকিল এবং d) সেই sales and distribution সমস্যা রয়ে যায়...
এইজন্য, আজকের লেখাটিতে কবিতার সাইন্স ও আর্টস নয়, একটু মনোনিবেশ করতে চাই কবিতার কমার্স এর ওপর, কারণ একটাই...কবিতার আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই! কবিতায় দীক্ষা ...কবিতার সংক্রামণ...কবিতার eco-system গড়ার ও বজায় রাখার জন্য একটি force...অনস্বীকার্য...যাকে শ্রী-অরবিন্দও স্বীকার করেছেন একটি impersonal and universal force হিসাবে...তা হল "money" ! কি আশ্চর্য coincidence যে আমি এটি লিখছি সুনীল স্মারক একটি সংখ্যায়! সুনীলও সফল ভাবে কৃত্তিবাসকে ও কবিতা [এবং একসময় পরিবারকে] ধারণ করেছেন, এই "কমার্স" এর দিকটি (হয়তো অজান্তে বা সজ্ঞানেও] বজায় রেখে... তো "কবিতার কমার্স" বস্তুটি কি? কি ভাবে এই উপরের সমস্যা গুলি সমাধান করা যেতে পারে? বলছি সংক্ষেপে এবং আরো জানতে চাইলে... পরে কখনো আবার আসবো বিশদ আলোচনায়...
ইন্টারনেট ও সোশাল নেটওয়ার্ক আমাদেরকে এমন একটা অভূতপূর্ব ভাবে কাছে এনে দিয়েছে, দূরত্ব, সময় বিভাজন, সব অতিক্রম করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা সব বাঙালীদের, যে শুধু কবিতা প্রকাশ ও পড়া নয়, স্বচ্ছন্দে আমরা বই নির্মাণ ও বন্টনের কথা ভাবতে পারি, একটা দায়িত্বশীল অঙ্গীকার নিয়ে, সাংগঠনিক ভাবে প্রকাশনী করে, যেখানে collection & distributions হবে এই ইন্টারনেট ও সোশাল নেটওয়ার্ক অবলম্বন করে। অর্থাৎ, একটি সংগঠন করা যেতে পারে যেটি কবিতার উন্মেষ, ধারণ ও বহন, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম, করে চলবে, কবিতার সাইন্স ও আর্টস শুধু নয়, কবিতার কমার্স ও গড়বে সাফল্যর সাথে...অর্থাৎ কৃত্তিবাসের মতনই...প্রকাশ উৎসাহ, প্রকাশনী, অনষ্ঠান, ম্যাগাজিন, বই, পুরস্কার, সশরীর আড্ডার সাথে জুড়তে চাই বই বন্টন...Facebook ও Web এর মাধ্যমে...
ভাবুন না এরকম...সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত করলো নিজেকে উচ্চমানের কয়েকটি বই প্রকাশ করে, এরপর, বই নির্মান কালীন, বই হাতে আসার আগেই হয়তো 500 কপি বই শেষ! pre-sold! কেন নয় যেখানে কবির 2000 বন্ধু, plus কবিতার group গুলি মিলিয়ে হয়ত 10000 জন দেখছেন বইটির আবির্ভাব! শুধু এক এক জন কবির বই নয়, বিভিন্ন রকমের সংকলনও তৈরী করা যেতে পারে...এবং এর সাথে কবিতা পাঠের আসর, তার প্রচার ও যোগাযোগ, এবং সাংঠনিক ভাবে সুন্দর কবিতার বইএর নির্মাণ ...অর্থাৎ একটি বইএর বিক্রয় অর্থ থেকে পরের আরো তিন চারটি বই নির্মাণ... এমনকি এরকম কবিতার সফল কমার্স ও সংগঠন কয়েকজন কবিতা-প্রেমিক কর্মীর কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে পারে...কবি দুস্থ হলে তাঁর হাতে টাকা পয়সা এনে দিতে পারে। তৃপ্ত পাঠক! কবিতা পেয়ে...বইটি পেয়ে! তৃপ্ত কবি! তাঁর সৃজন..পাঠকের দরবারে পেশ! তৃপ্ত কবিতাকর্মী! সে এই মেলবন্ধন ছাড়াও একটি অনন্য উপস্থিতি তৈরী করলো একটি সুন্দর কবিতার বইএ...
এই গুণ, মান, শুদ্ধতা এবং অর্থ সংস্থান ও বন্টন -- সবকিছু মিলিয়ে, সা্ফল্যময় একটি কবিতা-কমার্স পরিকাঠামো গড়ে তোলার সময় এসেছে...কবিতার তীব্রতা, সৌন্দর্য, শুদ্ধতা ও আত্মাকে নিটোল বজায় রেখেই!
ভেরী বাজছে...ঝড়ের ঝনঝন ঝংকারে.... আসুন না...একসাথে মিলেমিশে কিছু একটা করে দেখাই!
পরিশেষে '' সুনীলে '' শেষ সংখ্যায় এবং দীপাবলি সঙ্কলনে সকল কবি ও আত্মার সান্নিধ্যের সকল সহযাত্রীদের জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা । হার্দিক শুভেচ্ছা জানাই শব্দের মিছিলে উপস্থিত সকল পাঠক , পাঠিকাদের । যাদের প্রেরনায় আমাদের পথ চলা ----
কলকাতা ।
অমিতাভ দাশ
Reviewed by Pd
on
নভেম্বর ১৪, ২০১২
Rating:
Reviewed by Pd
on
নভেম্বর ১৪, ২০১২
Rating:

দাদা, বেশ সুন্দর হয়েছে, শুধু একটা জায়গাতে একটু পরিমার্জিত কোরলে ভালো হয় মনে হয় - 1) প্রথমত এই শুদ্ধ তীব্র কম্পন, চেতনার স্পন্দনকে উপলব্ধি ও আত্মনিহিত করতে শেখা এবং তারপরে আরও তীব্রতর গভীরতর কিছুর অণ্বেষণ নিজে থেকেই সত্তাকে অধিকার করে নেয়...অর্থাৎ জীবন যদি মনুষ্য চেতনার আরোহন ও বিবর্তন হয়, কবিতা সেই যাপনে অন্যতম ভূমিকা নিয়ে নেয়, আর - এই অংশের "জীবন যদি মনুষ্য চেতনার আরোহন ও বিবর্তন হয়" এই টুকুকে এভাবে না লিলখে যদি লেখেন "জীবন যদি মনুষ্য চেতনার আরোহন, অবরোহণ এবং তার ফলাফল হিসেবে বিবর্তন হয়" - তাহলে, আমার মনে হয়, আরো ভালো হোতো।
উত্তরমুছুনভাই শামীম... "ফলাফল" result শব্দটি বেশ গন্ডোগোলের এখানে...Quantum Mechanics এর মতনই experiments and process and intention of experimenter "bias" the results of the experiment..তাই সহজ ভাবে একটি upward spiraling evolution of consciousness ই রেখেছি...চেতনা ও কবিতার সৃজন ও উপলব্ধি নিয়ে আরো আলোচনার ইচ্ছে রইল ভবিষ্যতে...
উত্তরমুছুন