
"সুনীল শিখর"
বিংশ শতকের শেষার্ধে বাংলা সাহিত্যে যে কজন দিকপাল সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছেন তার অন্যতম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের, সাহিত্যকীর্তির দুইটি মূল বৈশিষ্ট হল; তিনি তাঁর সমকালের চেতনা প্রবাহকে বাণী দিতে পেরেছিলেন! অর্থাৎ ধরতে পেরেছিলেন যুগের অন্তরকে! আর নাগরিক জৌলুসের সপ্রতিভ মানসকে খুব সরাসরি প্রতিফলিত করতে পেরেছিলেন তাঁর ভাষা শৈলীতে! ফলে বর্তমানের নাগরিক জীবন বাস্তবতার চালচিত্রের একজন দক্ষ রূপকার হিসেবে তিনি আপামর বাঙালি পাঠকের অন্তরে এক বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছেন!যে কোনো সাহিত্যিকের জীবনেই এই সাফল্য যথেষ্ট ঈর্ষণীয়! বিশেষ করে দুই বাংলার সাহিত্যমোদী পাঠকের আন্তরিক ভালোবাসায় অভিষিক্ত তিনি!
সাহিত্যের প্রকরণে সুনীল একটা স্পষ্ট তরতাজা এবং জীবন্ত ধারার সৃষ্টি করে গেছেন! যেখানে তার চরিত্র গুলির সাথে পাঠকের অন্তর জগতে চলতে থাকে এক সরাসরি কথপোকথন! এই নিভৃত সংলাপের পরিসরটি সুনীলসাহিত্যের আর একটি বৈশিষ্ট! এবং তাঁর এই বিপুল পরিমাণ জনপ্রিয়তার গোড়ার কথা! প্রায় পাঁচ দশকের উপর সমাজ জীবনের পরতে পরতে ঘটতে থাকা পরিবর্তনগুলি, তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে কি ভাবে প্রতিভাত হয়েছে তাঁর লেখক সত্তায়; সেই চিত্র রয়ে গেল তাঁর বিপুল সৃষ্টির ধারাবাহিকতায়!
যে কোনো নিবিষ্ট পাঠকের বোধে ধরা পড়বে সেই চালচিত্র! বর্তমান সমাজভাবনার নানা অনুষঙ্গগুলি তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে কালের ধারাবাহিকতায়! বয়সের অভিজ্ঞতায়!
শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে! গদ্য এসেছে পড়ে! তাও সম্পাদকের উৎসাহে!
স্বাধীনতা উত্তর বাংলা কাব্যসাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আগমন যৌবনের তূর্য্য বাজিয়ে সবেগে! একদিকে তিরিশের কবিদের প্রবল উপস্থিতি আর একধারে রবীন্দ্রনাথ!
এর মধ্যে তিনি আসলেন একেবারে সময়োচিত নিজস্ব ঢঙে! আসলেন পড়ালেন আর জয় করলেন! পাঁচের দশক অব্দি বাংলা কাব্যসাহিত্যে চলে আসা সাহিত্যধারার ভিন্ন স্রোতে স্বরক্ষেপন সুনীলের, বৈশাখী সমীরণের মত নব ঋতুর আগমনী সুরে! পাঠক তাঁর লেখায় প্রথমেই যে আলোটা পেল সেটা হল তাঁর লিখন শৈলী! এত আটপৌরে! এত সাবলীল! যেন প্রতিদিনের
কথোপকথন থেকে উঠে আসা জীবন অভিজ্ঞতার অনুলিখন! পাঠক পেল লেখকের জীবন্ত স্পর্শ!
তাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় পাঠক পেল নিজের সমগোত্রীয় এমন একজন কবিকে যিনি পাঠকের ভাষা ব্যবহার করেই পাঠককে টেনে নেন কাব্যজগতের নতুন যুগের আবহে! এবং এখানেই কবি হিসেবে তাঁর সাফল্য যে; প্রায় তাঁর হাত ধরেই বাংলা কাব্য সাহিত্যে শুরু হল এক নতুন যুগ! তাঁর কবি সত্তায় লেগেছিল আন্তর্জাতিক কাব্য আন্দোলনের ছোঁয়া! বিশিষ্ট মার্কিণ কবি আলেন গিন্সবার্গের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যতার সূত্রে সে সময়ের মার্কিণ কাব্য আন্দোলনের প্রতিভাসে আলোকিত হলো তাঁর কবি সত্তার অন্তর্লোক! সেই স্রোতধারায় পুষ্ট হতে থাকল সুনীলকবিতার নির্যাস!
বাংলা কাব্যের পাঠকের মনোজগতেও ঘটতে থাকল সুনীল বিস্তার!
আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রায় প্রবাদপ্রতীম! গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর গল্প উপন্যাসে তিনি বাংলার পাঠক কূলকে টেনে নিয়েছেন সুনীলবৃত্তে! তাঁর লেখনীর যে জাদুতে মোহিত করেছেন তাঁর কবিতার পাঠককে, সেই জাদুতেই বশ করেছেন গল্প উপন্যাস প্রেমীদের! প্লটের বৈচিত্রে চরিত্রের বৈভবে তাঁর গল্প উপন্যাস সবসময়েই বেস্ট সেলার! অর্ধ শতাব্দী ধরে তাঁর লেখা ছাড়া শারদ সম্ভার পূর্ণ হয় না! প্রকাশকদের ব্যাবসার চালিকা শক্তি আজও সুনীলসাহিত্য! এখানেই তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছেন সমসমায়িক সাহিত্য রথীদের! তাঁর গদ্য সাহিত্যের ক্যানভাসটার পরিসর যথেষ্ট বিস্তৃত! বিষয় বৈভবে ও অনুভবী মননশীলতায়!
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নাগরিক জীবনের যে বিস্তার তার পরিধিতে বাঙালি পাঠকের বৃহত্তর অংশ খুঁজে পেল প্রতিদিনের চেনাজানা অতিপরিচিত জীবনের খণ্ড কাব্য গুলির অখণ্ড জীবনের গল্প! এখানেই তিনি জিতে নিলেন বাংলার পাঠক কূলের মন প্রাণ ভালোবাসা! সেই ভালোবাসার অভাব তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন ঘটেনি! গল্প বলার এক আন্তরিক আবহে অর্ধ শতাব্দীর উপর বাংলা গদ্যকে তিনি দিয়ে গেলেন অদম্য ঋজুতা! হয়ত সেই নির্মেদ ঋজুতাই সুনীলসাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখবে আরও বহূদিন! বিশেষ করে তাঁর গল্পের চরিত্ররা যেখানে উঠে আসে আমাদেরই চারপাশের জীবন প্রবাহ থেকে! সেখানে বাংলার নাগরিক সমাজ জীবনের অনুষঙ্গই দীর্ঘজীবী করবে সুনীলসাহিত্যকে!
নীললোহিতের জগৎ থেকে নীরার ভূবন! সুনীলসাহিত্যের এই অম্লান বিস্তারে বাঙালি পাঠক তাঁর প্রতিদিনের জীবনের বাঁধাধরা প্রাত্যহিকতার ঘেরাটোপের মধ্যেও এমন একটা মুক্তির স্বাদ পেল যেটা অত্যন্ত ঘরোয়া হয়েও উন্মুক্ত বিশ্বপ্রাণের সাথে অনায়াস সামঞ্জস্যে সমৃদ্ধ!
যার মধ্যে বিপ্লব নেই! কিন্তু স্বাধীনতা আছে! আত্নবিসর্জনের ব্যাকুলতা নেই বরং আত্মোপলব্ধির প্রয়াস আছে! সমষ্টি থেকে ব্যাক্তিত্বের বিচ্ছিন্নতা নয় অথচ সমষ্টির মধ্যে ব্যাক্তিসত্তার বিলয়ও নয়!
ফলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নিজস্ব এই ঘরাণায় বাংলার পাঠক পাঠিকা পেয়ে গেল অতি চেনা প্রতিদিনের দেখা হওয়া এক সহচরকে, যিনি জনঅরণ্যেরই একজন!সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এক অম্লান বন্ধু!
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে কোনোরকম ভণিতা না থাকায় তাঁর লেখকসত্তা আর ব্যক্তিসত্তার মধ্যে অনতিক্রম্য দূরত্ব ছিল না! বরং খোলামনের মানুষ হিসেবে উন্মুক্ত রেখেছিলেন জীবনচর্চার অনুষঙ্গগুলি!
এই স্বচ্ছতা তাঁকে বাঙালির আরও কাছের মানুষ করে তুলেছিল! ধর্মীয় মোহান্ধতা নয়, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীবদ্ধতা নয়, মানব প্রেমে বিশ্বস্ত মানুষটি সমস্তরকম বিভেদ বিভক্তির উর্দ্ধে ছিলেন বলেই, কাঁটাতারের দুইপারেই তিনি সমান জনপ্রিয়! এবং রবীন্দ্রনাথের পর এই বিপুল জনপ্রিয়তা আর কোনো সাহিত্যিক হয়ত অর্জন করেননি! রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি একই রকম দায়বদ্ধ ছিলেন! এবং দুই বাংলার বিচ্ছেদের বিপরীতে বিশ্বস্ত ছিলেন আজীবন!
সাহিত্যিক আসেন! সাহিত্যিক চলে যান! কালের খেয়া পথে রেখে যান মণি মাণিক্য ঐশ্বর্য্য! থেকে যায় সাহিত্য, পুষ্টির নির্যাসে পুষ্টতর হয়ে আবহমানতায়! অনেকেই বলেন ইন্দ্রপতন! অপূরণীয় ক্ষতি মনে করে শোকার্ত হন অধিকাংশ, কিন্তু সোনারতরীতে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই! যেতে যে হবেই! শক্তি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যেতে পারি কিন্তু কেন যাব? কিন্তু নিরুত্তর মহাকালে শক্তির সে চ্যালেঞ্জ সময়মতো মিলিয়ে গেছে! এবার গেল অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধুর সুনীল আকাশ! কিন্তু বাংলার সাহিত্যাকাশে দুই বাংলার এই বিপুল জনপ্রিয়তায় অভিষিক্ত হয়ে আরও কয়েক শতাব্দী প্রদীপ্ত থাকবে সুনীল শিখর!
♪♫•*¨*•.¸¸
শ্রীশুভ্র
Reviewed by Pd
on
অক্টোবর ২৭, ২০১২
Rating:
Reviewed by Pd
on
অক্টোবর ২৭, ২০১২
Rating:
কোন মন্তব্য নেই:
সুচিন্তিত মতামত দিন