ইফতেখারুল হক



গত কিছুদিন থেকেই মেঘের আকাশে সূর্য নেই ! সূর্য গেছে কোন বনে ? কার সাথে প্রণয়ের মালা গাঁথতে গেছে ? সে কী চেয়েছিল দীর্ঘ ছুটি আকাশ থেকে ? নেই, নেই একেবারেই নিখোঁজ ! অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর বাতাসের আধিপত্য। চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেছে । মধ্য দুপুরেও যেন ধরা দিয়েছে অনায়াসে সন্ধ্যার কালো রূপ,রূপসী রূপ । তার নিজস্ব রঙ ও গন্ধ ছড়িয়ে গেছে দিকেদিকে । অনেক, অনেক দিন আমি এমন দেখিনি । দেখিনি অন্তত এক ঘেয়ে নাগরিক জীবন ও তার নগ্ন নগর সভ্যতায় আলোর সূর্যকে নিখোঁজ হ’য়ে যেতে ! তবে কী সে-ও বোঝে নাগরিক জীবন ও সভ্যতার যাবতীয় ক্লেদাক্ততা ? তবে কী সে বোঝে মানুষের কান্নার অর্থ,  বোঝে কী বেদনার গাঢ় নীল রঙে আচ্ছন্ন মানুষের মন ? যাদের একমাত্র সংগীতের নাম ‘হাহাকার’ ।  বোঝে কী মানুষের অসভ্য  দর্শন ,নগ্ন  ক্রিয়াকলাপ  ?  আমরা পারিনা কিন্তু ওরা পারে সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে ,পারে অসময়ে ভয়ংকর ভাবে এলোমেলো করে দিতেও ।  সে-ও কী জানে মাঝে মাঝে অভিমানী হ’তে হয় ? কিন্তু কার উপর অভিমান ? আমাকে অন্তত ভাবিয়ে তোলে । ভাবতে ইচ্ছে করে আর প্রশ্ন জাগে, দীর্ঘ আলোর পর দীর্ঘ ছায়া তলে কী আশ্রয় নিয়েছে সে ? কার সাথে এতো মাখামাখি ? কার সাথে গোপন সন্ধি হয়েছিল ওর কোন একদিন ? ছায়া নীরবতার সাথে কি প্রেম তার ? মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে কি ? প্রশ্ন জাগে কিন্তু কেন ?

আচ্ছা, মাঝে মাঝে কী আলোর সূর্যটা নিখোঁজ হ’তে পারেনা ? বেড়াতে যেতে পারেনা কোন দূরের আত্মীয় বাড়ি ? প্রেম করতে পারেনা ছায়া নীরবতার সাথে ? আলিঙ্গনে শীতলতা অনুভব সেওতো করতে পারে ।সেওতো স্থাপন করতে পারেলোভনীয় সম্পর্কের সেতুবন্ধন ?

আমরা মানুষেরা কতোটাস্বার্থপর আশ্চর্য ! আমরা মানুষেরা কেবলই আলো চাই অথবা কেবলই দীর্ঘ ছায়া ! ভুলে যাই আলো আর ছায়ারযুগলবন্দীতেও আছে সীমাহীন সৌন্দর্য, সু-মধুর সুর; সেই থেকে গান ।ভুলে যাই আষাঢ়েরও একটি নিজস্ব গল্প থাকতে পারে ব্যথার, হয়তো সুখেরও;শ্রাবণের থাকতে পারে একটি প্রেমময় উপাখ্যান বিষাদের,এবংমেদুরতার । কিন্তু আমরা ভুলে যাই । আমরা মানুষেরা নিজেকে নিয়েই থাকিআত্মকেন্দ্রিকতার মধ্যভাগে ! ভাবিনা প্রকৃতি ও তার দুঃখ, বেদনা আর সুখের সাথে আমাদেরও আছে নিবিড় সম্পর্ক ।

নাগরিক জীবনের নাম ক’রে ভুলে যাই আমাদের অস্তিত্বের অনুষঙ্গ গুলোকে যা আছে জীবনে যেমন প্রকৃতিতেও তেমন ।আলোর সূর্য তুমি কিছুদিন নিখোঁজ থাকো, আলোর সূর্য কিছুদিন তুমি আড়াল হয়ে থাকো । তুমি বেড়াতে থাকো তোমার নামহীন আত্মীয় বাড়ি । আলোর সূর্য তুমি গভীর থেকে গভীরতর প্রেমে আচ্ছন্ন হ’য়েভুলে যাও মানুষ ও তাঁর জীবনের কথা । এই নগর সভ্যতার যে ক্লেদাক্ততা তার কথা । তুমি ছায়ার সাথে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ডুবে যাও নদী কিংবা সমুদ্র জলে । লুকিয়ে থাকো পাহাড়ের বুকে । তুমি সঙ্গম করো, তুমি সংসারী হও ।

তুমি নেই, গত কয়েকটা দিন ধ’রে আমি আকাশের দিকে থাকিয়ে তোমাকে খুঁজি । দেখতে পাইনা !তবে মনটা যে বেশি খারাপ তা নয়। আমি আজ প্রার্থনা করি যেন তুমি কিছুদিন ফিরে না আসো।তুমিতোতোমার প্রতিদ্বন্দ্বী মেঘ আর বৃষ্টিকে ছেড়ে দিয়েছ তোমার স্থান বিনা শর্তে; যদিও সাময়িক । মাঝে মাঝে বুঝি শর্ত না দিয়ে জায়গা ছেড়ে দেবার মাঝেও আনন্দ আছে । মাঝে মাঝে বুঝি সহাবস্থানেও অনেক সুখ।তুমি বোঝ এমন সরল অংকটি অথচ আমরা মানুষেরা বুঝিনা! কখন বুঝবো আমরা ? মৃত্যু এসে দুয়ারে দাঁড়ালে ? কিন্তু তখনতোবেলা শেষের পথিক আমরা। কালো রঙের যে সীমানা তার খুব কাছাকাছি । 

ঢাকা শহরে বৃষ্টি হয়নি অনেকদিন । সম্ভবত পুরো বাংলাদেশেই । মেঘের গর্জনে কেঁপে ওঠেনি অনেকদিন মানুষের বুক । মানুষের শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছিল দৈনন্দিন জীবনের ক্লেদাক্ত ঘাম, উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে যখন তখন; ভাবেনি অনেক কিছুই । ভাববার সময় কই মানুষের? নাগরিক জীবনে পঙ্কিলতা দূর ক’রতে ক’রতেই যেখানে সময় পার ! আজ অঝোরে বৃষ্টি নেমে ধুয়ে দিচ্ছে আমাদের সকল ক্লান্তি, সকল পরিতাপ; নগর ও জীবনের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা । আজ চাই ধুয়ে মুছে যাক এই আষাঢ়ের বৃষ্টিতে মানুষের যতো খেদ যতো জটিলতা । ধুয়ে যাক মনের সঙ্কীর্ণতা, ঘৃণা আর অহংকার । ‘আষাঢ়’ তুমি প্রাণের গভীরে ঢুকে প্রাণবন্তক’রে তুলো আশাহত মানুষকে । ‘শ্রাবণ’ তুমি হৃদয়ের মাঝে স্থাপন করো চিরকালের শীতলতা ।

আষাঢ় শ্রাবণের মিলন ক্ষণে এই যে এই রোদ, এই যে এই বৃষ্টি তার দৃশ্য অবলোকনে শহর কোন আদর্শ জায়গা নয় । যদিও ওরা বোঝেনা স্থান,কাল আর সময় । প্রকৃতির অব্যাহত পালাবদলের ওরা নিয়মিত সঙ্গী ।

আমি কী আজকাল খুব বেশি দেখি আষাঢ়ের বৃষ্টি আর শ্রাবণের ঘন সন্ধ্যাবেলা ? দেখি নিশ্চয়ই দেখি, এই শহরের কোন এক জায়গা থেকে । আসলে বলা যায় চার দেয়ালের মাঝ থেকে বেড়িয়ে বারান্দার কোণে ব’সে কিংবা দাঁড়িয়ে শুনি প্রিয় আষাঢ়েরগল্প আকাশে অপলক চেয়ে থেকে । দেখি প্রিয় শ্রাবণের অপরূপ দৃশ্য শূন্যে তাকিয়ে থেকে । যদিও এমন গল্প, এমন দৃশ্য শহরে নয় গ্রামে গিয়ে শুনলে দেখলেই বরং আরো আনন্দ পেতাম ।

প্রিয় বললাম কেন তাদের ? আসলেই কী ওরা প্রিয় আমার ? আমার কী প্রিয় নয় বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ? প্রিয় নয় ভাদ্র, আশ্বিন ? প্রিয় কী নয় কার্তিক, অগ্রহায়ন ? কিংবা পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র ? খুব প্রিয় এবং ওদের আমি ভালও বাসি । আমার বুকে এক একটি বাংলা মাসের জন্যে, এক একটি ঋতুর জন্যে অপরিসীম দরদ । তাদের প্রতি অশেষ ভালোলাগা, ভালোবাসা । আমার হৃদয় জুড়ে সবার স্থান । অবশ্য আমার ছেলেবেলায় আমি বিশেষ স্থান দিয়েছিলাম আমার হৃদয়ে পৌষ - মাঘ কে। অসাধারণ লাগতো আমার । আমি জ’মে যেতাম শীতের আমেজে । ভোরের আলো আঁধারে কিংবা ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় খড়ের আগুনে জ্ব’লে উঠত আমার নরম হৃদয় । কখনো হালকা কখনো ঘন তাপে বুকের ভেতর জমাতাম সারাদিন,সারারাতের সুখ ! খড়ের আগুন ও তার অনাবিল দৃশ্য আমি আজো ভুলতে পারিনা । আহা সেই ছেলেবেলা, আহা সেই পৌষ-মাঘ । এমন দৃশ্য আজো আছে তবে শহরের নয় । আজো জ্ব’লে ওঠে ভোরের আকাশ । আজো জ্ব’লে ওঠে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার । তবে এমন দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে যেতে হবে বহুদূর । কিন্তু তা আজ হবার নয় হয়তো ।

এই ঢাকা শহরেও জ্ব’লে ওঠে ভোরের আকাশ আর ঘন সন্ধ্যাবেলাখড়ের আগুনে পউশ-মাঘে । কিন্তু সেখানে আরো কিছু জ্ব’লেযায় নাম যার ‘হাহাকার’ ! জীবন যেখানে ক্ষণে ক্ষণে দুলে ওঠে, জীবন যেখানে ক্ষণে ক্ষণে রাস্তা বদল করতে বলে, জীবন যেখানে প্রতিনিয়ত পেছন থেকে ধাক্কা মারে, জীবন যেখানে নানা রকমেরকলাকৌশল শেখায় আর বলে-‘সংগ্রাম করো’; ‘অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য ছুটে চলো’ ! আমার প্রিয় ঢাকা, প্রিয় তিলোত্তমা ।আমার যৌবন আমার মধ্যবয়স ও তার একাকীত্বের প্রিয় সাথী । 

ছেলেবেলায় আষাঢ় শ্রাবণ আসলেই কেন জানি ভীষণ মন খারাপ হ’য়ে যেত আমার । মেঘ জ’মে ওঠতোমনের কোণে !বিষাদে ভ’রে যেত আমার প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত । আমার ছেলেবেলার আষাঢ় শ্রাবণের মুহূর্ত গুলো আজকালের মতো ক্ষণস্থায়ী ছিল না, ছিল দীর্ঘস্থায়ী । একবার বৃষ্টি নামলে আর থামতে চাইতো না । চলতো দিনের পর দিন;সহজে থামতে চায়তো না। ভারী বৃষ্টিতে চারপাশ জলে ভ’রে যেত । বন্যায় আক্রান্ত হতো কোন কোন এলাকা । বিলে, পুকুরে থইথই জলের অপরূপ দৃশ্যে পাগল হয়ে যেতাম । মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখতাম জলে, বিলে অঝোর ধারার বৃষ্টি দেখে । দেখতে পেতাম বিস্তৃত প্রান্তর বৃষ্টির চাদরে ঢেকে যাচ্ছে ।  ফসলের মাঠ, পথঘাট, খেলার মাঠ ডুবে গিয়ে পুরোপুরি দেখিয়ে দিত আষাঢ়ের - শ্রাবণেরআসল রূপ ।

ঢাকার বৃষ্টিকে মাঝে মাঝে কৃত্রিম লাগে আমার তবুও ভাল লাগে । যদিও আজকাল এমন বৃষ্টিতে ভিজিনা আমি, যেমন করে ভিজতাম আবার যেমন করে রোদে পুড়তাম আমার ছেলেবেলার বেলা অবেলায়, ফসলের মাঠে, ঘাটে কিংবা মাঠে । এই শহরে বৃষ্টি নামলেই স্মৃতি কাতরতা পেয়ে বসে যেন । কতশত যে স্মৃতি মনে আজো বেঁচে আছে ! চোখ বন্ধ করলেই আমি দেখি বৃষ্টি ভেজা পল্লী-গ্রাম, মেঠো পথ, কাদা মাটি । ফসল বোনা ক্ষেতের পর ক্ষেত এবং তার উপর বিরামহীন বৃষ্টি আর বাতাসের খেলা । ভেজা খেলার মাঠ, স্কুলে হাঁটুজল । খালে, বিলে মাছেদের উৎসব । বর্ষায় পুকুর উপচে পড়া জলের সাথে ভেসে আসা কই, রুই, বোয়াল, আর পুঁটি মাছ ও তাদের সোনালী, রুপালী দেহ রূপ;তাজা প্রাণ ! গ্রামে ভরা বর্ষায় মানুষের সংগ্রাম যাতে মিশে থাকত সুখ-দুঃখ, আনন্দ হইচই আর বিষাদ । বন্ধ চোখ খুলতে ইচ্ছা করেনা আমার । ভুলতে পারিনা আজো । সত্যিই কি ভুলা যায় ? সবসময় যে মনে পড়ে তা নয় । উপলক্ষ এলেই বরং স্মৃতিরা ডানা মেলে বেশি । এই যেমন কিছুদিন ধরে ঢাকায় খুব বৃষ্টি হচ্ছে আর আমার স্মৃতিরা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে কোটি কোটি মাইল পেছনে ফেলে আসা আমার শৈশব, আমার কৈশোরের কাছে !

আষাঢ় তুমি এমন ক’রেই এসো বারবার এই ধুলো মাখা জীবন ও নগরে; এসে গল্প করে যেয়ো মুহূর্তের পর মুহূর্ত আমার সাথে । শ্রাবণ তুমি বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা জলে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিও বারবার চারপাশে এমন করেই । ধুয়ে মুছে দিও মানুষের ক্লান্তি অবসাদ আর নাগরিক জীবনের সকল ক্লেদাক্ততা । ‘আষাঢ়’ তুমি শুধুই গল্পের পর গল্প হয়ে থাকো । ‘শ্রাবণ’ তুমি শুধুই বৃষ্টির পর বৃষ্টি হ’য়ে ঝরে পরো ।

পরিচিতি 

ইফতেখারুল হক ইফতেখারুল হক Reviewed by Pd on জুলাই ১১, ২০১৫ Rating: 5

২টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

banner image
Blogger দ্বারা পরিচালিত.