ভেজা চুলে চিরুনি বুলাতে বুলাতে নিজেকে ভাল করে দেখে নেয় শ্বেতা এই মধ্য তিরিশেও সে বেশ সুন্দরীই আছে , অন্তত ওর বয়সী আর দশ্টা মেয়ের থেকে ,শুধু ভাল করে পরখ করলে বোঝা যায় শরীরে কিছুটা মেদ জমেছে আর মুখের সারল্য তেমন থাকলেও চোখের কোণে যেন ক্লান্তি ভর করেছে ।আজ ও নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবছে কারন, অনেকদিন পর আজ সে সোহেলের সাথে একই মঞ্চে পারফর্ম করবে সেখানে সোহেলের বৌও নিশ্চয় থাকবে, শ্বেতার তো একবার অন্তত পরখ করে নিতে হবে কি নেই ওর যা রুমানার আছে ? যাকগে অতো ভাবতে আর ভাল লাগছে না ।
শ্বেতা খাবার ঘরে আসে, আজ ছুটির দিন ও নিজের হাতে অনুদা আর সারার পছন্দের বেশ কিছু খাবার রান্না করেছে , একটু পরেই অনুদা আসবেন তারপর মা সহ ওরা চারজনে খেতে বসবে ,শ্বেতা দেখে নিল সব ঠিকঠাক মত গুছিয়ে টেবিলে দেয়া হয়েছে কি না । অনুদা ওদের পরম আত্বীয় ,সোহেল চলে যাবার পর শ্বেতা যখন খুব ভেঙ্গে পড়েছিল তখন এই অনুদা ওর পাশে ছিল স্টুডেন্ট লাইফে অনুদা ছিলেন শ্বেতা আর সোহেলের গুরু ,ওরা তিনজনই সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ। নাটক গান আর কবিতা নিয়ে মেতে থাকতো তিনজন ।
আর স্টুডেন্ট লাইফ কেন ? অনুদার সাথে শ্বেতার পরিচয় ত সেই ছোটবেলা থেকে একই পাড়ায় বাড়ি ওদের আর শ্বেতার বড়ভাই শুভ্রর খুব কাছেরবন্ধু উনি , ওর প্রথম গান শেখার হাতেখড়ি ত অনুদার কাছেই। সেই কিশোরী বয়সে অনুদার সম্পর্কে শ্বেতার ভীষণ দুর্বলতা ছিল ,কিন্তু অনুদা যেন বুঝেও বুঝতে চাইত না ।
এক তুমুল বৃষ্টির দিনে গান শিখতে বসে শ্বেতা যেচে অনুদাকে নিজের ভাললাগার কথা বলেছিল তখন সে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে মাত্র , অনুদা চুপচাপ সব শুনলেন, কিছুবল্লেন না তখনই। হয়ত সেই মুহুর্তেই ওকে আঘাত করতে চায়নি ।
পরদিন শ্বেতা যখন ছাদে রেওয়াজ করছিল তখন অনুদা এসে ওর পাশে বসেছিলেন তারপর হারমোনিয়ামটা নিয়ে নিজেই গাইলেন'' মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে '' গান শেষ করে শুরু করেছিলেন কথা , বলেছিলেন,
...শ্বেতা যা বিধাতা দিতে চান না তা জোড় করে পেতে চেয়না । আমার সাথে তোমার অনেক কিছুতেই অমিল সবচেয়ে বড় অমিল আমাদের বয়স আর আমি অন্যএকজন কে ভালোবাসি। তোমায় আমি খুব কেয়ার করি ,তোমার ভালো চাই তোমার পাশে থাকতে আমার ভালো লাগে কিন্তু একে ভালোবাসা বলে ভুল করোনা আমাকে বড়ভাই কিংবা বন্ধু ভেব ।
শ্বেতা বলেছিল
===অনুদা তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।
কিন্তু অনুদা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন যদি আর একবার তুমি ভালবাসার কথা বল আমি আর কোন সম্পর্ক রাখবনা তোমাদের সাথে .. আমি বললাম না তোমাকে ভালোবাসি না , অলীক স্বপ্ন দেখনা তুমি ।
সেইদিন শ্বেতা খুব কষ্ট পেয়েছিল সারারাত কেঁদেছিল বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে হয়েছিল , মনে হয়েছিল অনুদা ওকে অপমান করেছে । কিন্তু তারপর নিজেকে শুধরেও নিয়েছিল অনুদাকে বন্ধু বলেই ভাবতে শুরু করেছিল।
তারপর কেটে গেল অনেকদিন অনুদা ব্যাস্ত ছিলেন নিজেকে নিয়ে । এইচ এস সি পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় একটা গানের প্রোগ্রামে গিয়ে পরিচয় হয় সোহেলের সাথে সোহেলকে ও আঁকড়ে ধরেছিল অনেকটা অনুদাকে ভুলতেই । একসময় ওকে ভালোও বেসেছিল আসলে কোন আসনই শুন্য পড়ে থাকে না বেশিদিন ।সোহেলের ভালোবাসায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল শ্বেতা নিজেও সর্বস্ব দিয়ে ভালবেসেছিল । বিয়ে ও করেছিল খুব আয়োজন করে ।
অনুদা মানে অয়নও খুব ধুমধাম করে বিয়ে করেছিল যাকে ভালবেসেছিল তাকেই সেই সুমি আপুকে। খুব সুখেই ছিলেন দুজনে কিন্তু সুমি আপু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান ,মা হারা সন্তানও তিনদিনের বেশী বাঁচেনি ।সেই থেকে অনুদার এই বাড়িতে আসাটা খুব বেড়ে গিয়েছিল সারাকে দেখতে , মাঝে কেমন পাগলাটে হয়ে গিয়েছিলেন ,সারাকে পেয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন ,আর বিয়ের তিন বছরের মাথায় সোহেলের সাথে যখন ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তখন শ্বেতার পাশে ছিলেন বড় ভাইয়ের মত অনেক চেষ্টা করেছিলেন ডিভর্স্টা আটকাতে কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ।
বিয়ের দু'বছরের মাথায় শ্বেতা ব্যাঙ্কে চাকুরী পায় । এখন ও চাকুরী করে ঘর সামলায় সারা আর মা কে নিয়ে ওর সংসার , সেখানে অনুদা বিশেষ যায়গা জুড়ে আছেন বন্ধুর মত ,অভিভাবকের মত যেমন আছে ওর বড় ভাই শুভ্র যদিও শুভ্র নিজের সংসার আর ব্যাবসা নিয়েই বেশী ব্যাস্ত থাকে তবুও মাসে দুই একবার ত মাকে আর সারাকে দেখতে আসবেই সাথে ভাবীও আসেন প্রায়ই।
উফফ!! আজ কেন যে এত অতীতের কথা মনে পড়ছে ? এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে শ্বেতা গেল সারাকে ডাকতে দেখল সারা কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে খুব ভালো মুডে আছে মনে হচ্ছে ,কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলো সারা অনুদার সাথে কথা বলছে ,ওর প্রতিটি কথায় কি উচ্ছাস আর আহ্লাদ!
ও বলছিল ...চাচু তুমি আসার সময় আমার জন্য ''এইচ হ্যাগার্ড এর দি রিটার্ন অফ শী ''বইটা নিয়ে এস আবার নতুন করে সবটা পড়তে ইচ্ছে করছে ...কই এভাবে তো কখনো শ্বেতার কাছে কোন আবদার করেনা ও ?
আনমনা হয়ে যায় শ্বেতা তবে কি মেয়েটা ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ? অনুদা আর শ্বেতার সম্পর্ক নিয়ে সারার মনে কোন প্রশ্ন জাগেনি তো? যা ওদের মাঝে এই আড়াল তৈরি করেছে ! পরক্ষনেই ভাবে , তা কেন হবে সারাকে শ্বেতা খুব যত্নে বড় করেছে ,সমাজের এই জটিল দিকগুলো সম্পর্কে ওকে বুঝিয়েছে আর এও বুঝিয়েছে অনুদা শুধুই শ্বেতার একজন ভালো বন্ধু ,বিপদে- আপদে সুখে দুঃখে ওরা চারজন সবসময় একসাথে ছিল আছে আর থাকবেও রক্ত সম্পর্ক ও হার মেনে গেছে ওদের এই আত্বিক সম্পর্কের কাছে । ও বুঝতে পারে , বাবা কি জিনিশ তাতো কখনো বোঝেইনি সারা অনুদা সেই আদর ওকে দিয়েছে তাই অনুদা অনাত্মীয় হয়েও এত কাছের মানুষ হতে পেরেছে , মারও অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস অনুদার ওপর আচ্ছা এইযে আত্ব্যিক সম্পর্ক এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে ?
শ্বেতা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় খোলা হাওয়ায় একটু নিঃশ্বাস নেয়া দরকার এত প্রশ্ন মনের মাঝে ফোঁড়ন কাটছে যে ও হাঁপিয়ে উঠেছে , তাকিয়ে দেখে বাইরে চোখ ধাঁধানো রোদে মাধবীলতায় কয়েকটা টুনটুনি মনের আনন্দে দোল খাচ্ছে আর লাল -হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলের চারপাশে , এমন দৃশ্য যে কাওকে উদাস করার জন্য যথেষ্ট ! একটা দীর্ঘশাস বেড়িয়ে আসে বুক চিরে , এরকম দুপুরে খুব মন কেমন করে। ওর একাকী জীবনে মেয়ে সারা একমাত্র অবলম্বন মা ওর বন্ধু , আশ্রয়স্থল আর অনুদা ওর নির্ভরতা ।
কলিং বেলটা বেজে উঠলো আর সঙ্গে সঙ্গে জানালার গ্রিলে বসা চড়ুইটা ভয় পেয়ে উড়ে গেল । যেন এক নিমেষে পুরো অতীতটা উধাও হয়ে গেল পাখিটার মতই ,অনুদা এসে গেছেন , মাও এলেন বসার ঘরে শ্বেতা গেল সারাকে ডাকতে ।
খাওয়া শেষ করেই শ্বেতা চলে গেল তৈরি হতে আজ ওর গানের প্রোগ্রাম আছে ওখানে অনুদা সোহেলও গান গাইবে আজ , রেডি হয়ে এসে সারাকে আদর করে ওরা বেড়িয়ে পরে মাকে বলে যায় দেরী হলে চিন্তা করোনা মা ।খেয়ে নিও সারাকে খাইয়ে দিও ।
সারাপথ শ্বেতা ভাবতে থাকে এত বছর পর সোহেলকে দেখে ও নিজেকে সামলাতে পারবেত ? সোহেল কি আগের মতই আছে ?সারার মুখটা কি ওর মনে আছে ? মনে আছে কি সারা নামের ওর একটা সন্তান আছে যাকে সে তিন মাস বয়সের পর আর কনদিন দেখেনি ? আর অনুদার সাথে এই যে সম্পর্ক একি শুধুই বন্ধুত্ব ? কাছের মানুষ ? মায়ের কাছে উনি ছেলের মত তাই কি? সত্যিকার অর্থে ছেলের চেয়েও বেশি কাছের নয় ? আর সারার কাছে শুধুই কি চাচু ? চাচু কি এতোটা কাছের হতে পারে বাবার মত ?আজ যদি সোহেল এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করে কোন জবাব আছে কি শ্বেতার কাছে ?
গাড়িটা চলছে কখনো জ্যামের মাঝ দিয়ে কখনো ফাঁকা অলিগলি ঘুরে গান বেজে যাচ্ছে সে গান শ্বেতার তন্ময়তাকে ভাঙাতে পারছেনা। কিন্তু তন্ময়তা ভাঙল হাতের স্পর্শে চমকে উঠলো শ্বেতা ।
অনুদা বললেন শ্বেতা এসনা নতুন করে জীবনটা শুরু করি ...
শ্বেতা বলল তা আর হয়না অনুদা ,যদিও আজ এতোটা পথ আমরা একসাথেই হেঁটেছি তবুও দুটো জীবন বয়ে গেছে আলাদা পথে । সারা আমার যতটা তোমারও ততোটা আদরের আমি জানি ।
----তাহলে কেন হয়না শ্বেতা ?
----হয়না অনুদা কারন আমাদের জড়িয়ে যে মানুষগুলো বেঁচে আছে আজ এতকাল পর একপথে চলতে গিয়ে তাঁদের জীবনে ছন্দ পতন ঘটাতে পারবো না আমি । তাছাড়া আজ এত বছর আমি এই একলা ব্যস্ত জিবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি সেখানে তোমাকে মেনে নিতে পারবোনা ।
অয়ন হাতটা সরিয়ে নেয় , শ্বেতা হেসে বলে তাই বলে বন্ধুত্বটা কিন্তু অস্বীকার করিনি । তুমি এভাবেই আমাদের পাশে থেক অয়ন ।
![]() |
| পরিচিতি |
ফারহানা খানম
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
সুচিন্তিত মতামত দিন