মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর


সম্পাদকীয়তা লেখা যখন শুরু করেছিলাম , আচমকা খবর এল সমকালীন বাংলা সাহিত্যর প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ইহলোকের মায়া ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন অজানা সেই দেশে। স্বল্প দিনের ব্যবধানেই পর পর দুটি নক্ষত্রের পতন। হুমায়ুন আহমেদ এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

সব্যসাচী লেখক ছিলেন সুনীল। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা তথা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় তাঁর ছিল মুন্সিয়ানা। তবে পাঠক হৃদয়ে সবচেয়ে বেশী সাড়া জাগিয়েছে তার কবিসত্তা এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায়। তার সম্পাদিত কৃত্তিবাসকে কেন্দ্র করেই বাংলা কবিতার গঠনে ও মননে আধুনিকতার জোয়ার প্রবলতর হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। কবিতার প্রতি তার প্রেম-ভালবাসা এবং কবিতার সাথে তার গেরস্থালী ছিল আজীবন। কবিতার জন্যই তিনি প্রার্থনা করেছিলেন দীর্ঘ জীবনের।

“শুধু কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।
মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু
কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।''

তবুও শেষটায় ভবিতব্যের কাছে মানুষ অসহায়। কবি সুনীলকেও চলে যেতে হল অসময়েই। তবে কবির কাব্যভূবন ঈশ্বরের বাণীর মতই অব্যয় অক্ষয় হয়ে থাকবে প্রজন্ম পরম্পরায় কবিতাপ্রেমী বাঙালীদের জন্য। বলা যায় মৃত্যুকে অতিক্রম করে মৃত্যুন্ঞ্জয়ী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবি সত্তা।

কবি সুনীল, তোমার তিরোধানে শোকার্ত চিত্তে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য , আমাদের শব্দের ,আমাদের ভাবনায় , আমাদের ভালোবাসায় - বিশেষ পাতায় '' সুনীলে '' ।

আজ পবিত্র ঈদ । প্রকাশিত হলো শব্দের মিছিলের  ঈদ সঙ্কলন । আজ ঘরে ঘরে  ঈদুল আজাহার আনন্দে মাতোয়ারা। কদিন আগেই উৎযাপিত হলো শারদীয় দূর্গাপূজা, বাঙালীর আরেকটি বড় আনন্দ উৎসব। এসব উৎসবগুলোর উৎসমুখ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতায় নিহিত থাকলেও এগুলোর ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা রয়েছে। প্রতিটা ধর্মেরই মর্মকথা হচ্ছে পার্থিব জীবনের সব অশুভ শক্তিকে বধ করে সত্য-সুন্দর প্রতিষ্ঠাকরণ। আর সত্য-সুন্দর তো সম্প্রদায় নিরপেক্ষ। সাহিত্য-সংস্কৃতি আর কবিতা প্রেমিরাও সত্য-সুন্দরেরই পূজারী। আশার কথা বর্তমান প্রজন্মের বাঙালীদের চেতনায় ক্রমশ:ই এ বোধ সঞ্চারিত হচ্ছে। তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আজ আমরা সকলেই সকলের প্রার্থনা , আনন্দ উৎসবে সামিল হই । এটাও একটা জয় , জয় মনুসত্তের ।

সকল সাম্প্রদায়িক কাঁটাতার ছিন্ন করে ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠুক সার্বজনীন আনন্দ উৎসব। শব্দের মিছিলে হাঁটা সকল কবি , পাঠক , পাঠিকা এবং পরম শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানাই  '' ঈদ মুবারক '' ।

স্বল্প আলোকপাত করি আমাদের  সাহিত্য প্রসঙ্গে । বোধগম্য কারণেই আলোচনায় আমি কবিতাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির ধারায় কবিতা একটি প্রাচিনতম শিল্প। লিপি আবিস্কারের পূর্ব থেকেই শ্রুতি এবং স্মৃতি নির্ভর কবিতা চর্চা বাংলার জনপদে হয়ে আসছে তা সাহিত্য ইতিহাসে প্রতিভাস। চর্যাপদ বাংলা কবিতার প্রথম স্মারক এবং পরবর্তীতে মধ্যযুগ পেড়িয়ে বিশ শতকে মাইকেল মধুসুদনের বিরল প্রতিভায় বাংলা কবিতা পায় আধুনিকতার ছোঁয়া। পরবর্তীতে সেটিকে আরো ব্যাপকতা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, রবীন্দ্রযুগে তার সমসাময়িক প্রায় সকল কবিই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বলয়ে। ব্যতিক্রম ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতার বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিকে  বাংলা কবিতায় তিনি সংযোজন করেন ভিন্ন মাত্রা।

রবীন্দ্রত্তোরকালে বিশেষত: ত্রিশের দশকে বাংলা কবিতা নতুন বাঁক নেয় জীবনানন্দ দাস, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী প্রমূখের পথ ধরে এবং যা এখনো নি:শেষ হয়ে যায়নি বলা যায়। আঙ্গিকের দিক থেকে কবিতা মুক্ত হয় পেয়ার কিংবা অন্তমিলের বেড়াজাল থেকে, কবিতা ঝুকতে শুরু করে গদ্যময়তার দিকে। কবিতার বিষয়বস্তুরও বৈচিত্রতা আসে। চিরন্তন নর-নারীর প্রেম, প্রকৃতি এবং ঈশ্বর বন্দনা ছাড়াও সমকালীন নাগরিক সভ্যতা, রাজনীতি ইত্যাদিও হয়ে ওঠে কবিতার বিষয়বস্তু।

কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা, বিশ্লেষণ - পর্যালোচনা  আগেও হয়েছে, এখনো চলছে। এই সবের মাঝেই রয়েছে কবিতার গতিময়তা এবং নতুন বাঁক। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কবিতা এখন আধুনিক যুগকে অতিক্রম করে উত্তর আধুনিক যুগে প্রবেশ করার প্রয়াস পাচ্ছে। ক্রমশ:ই কবিতার অবয়বে পরিবর্তন আসছে, মেদ ঝরছে শরীরে, ছন্দ ও অলংকার ব্যবহারে আসছে ভিন্ন আমেজ। অধুনা অনেক কবিই রূপকের চেয়ে অতিরূপকেকই প্রাধান্য দিচ্ছেন তাদের কবিতার রচনাশৈলীতে।

কবিতা আধুনিক কিংবা উত্তর আধুনিক যাই হোক না কেন সার্থক কবিতায় অবশ্যই এমন আবহ থাকতে হবে যা বোধের ভেতরে বোধকে টোকা দিয়ে পাঠকের মনে সাড়া জাগাতে পারে এবং আগ্রহ সৃষ্টি করে আরো কবিতা পড়তে।

অন্তর্জালকেন্দ্রিক কবিতাচর্চা  নিঃসন্দেহে তথ্য প্রযুক্তি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে এনে দিয়েছে আলাদিনের চেরাগ, সংযোজন করেছে অভূতপূর্ব মাত্রা। অন্তর্জাল নির্ভর বিভিন্ন ব্লগ কিংবা সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেইসবুক নির্ভর বাংলা কবিতা চর্চা যেভাবে গতি পেয়েছে তাতে সত্যিই অভিভূত হতে হয়। অন্তর্জাল নির্ভর অসংখ্য কবিতা মঞ্চের বাস্তবতাই প্রমান করে কবিতাই মূলত: বাঙালীর সংস্কৃত চেতনার প্রাণভোমরা।

অন্তর্জাল নির্ভর কবিতা চর্চা কবিতাপ্রেমীদের সত্যিকার অর্থেই রূপান্তরিত করেছে বিশ্ববাঙালী হিসেবে এবং সঠিক অর্থে বিশ্বায়ন ঘটেছে এখানেই। ভৌগলিক অবস্থান এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, প্রকাশোন্মুখ কবিরা যে যেখানেই থাকুক না কেন তারা পেয়েছে তাদের শিল্পকর্ম প্রকাশের উপযুক্ত মঞ্চ। বিভিন্ন প্রজন্মের কবিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সব কবিতামঞ্চ হয়ে ওঠেছে বর্ণিল, বৈচিত্রময়। বিশেষত: কবিতাচর্চায় নারী সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ আশাপ্রদ। অতীতে মুদ্রণনির্ভর কবিতা চর্চায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। আশা করা যায় অন্তর্জাল নির্ভর এ কবিতা চর্চায় নারীদের মাঝ থেকেও অনেক প্রতিভাবান কবি বেরিয়ে আসবেন এবং আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করবেন ।

শব্দের মিছিলের ' বর্তমান সংখ্যাকে যারা কবিতা,অনু-কবিতা, প্রবন্ধ সহ নানা ধরণের লেখা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সেই সাথে সাহিত্যপ্রেমী পাঠকদের জানাই শুভেচ্ছা। আপনাদের ভালবাসাই শব্দের মিছিলের চালিকা শক্তি।

পরিশেষে শব্দের মিছিলে যারা-র নেপথ্য কুশলীদের  জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ। সাহিত্যের প্রতি এবং সার্বিক প্রসারে এদের প্রয়াস , প্রীতি ভালবাসা সত্যিই আমাদের মুগ্ধ করে।জয় হোক বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা। জয় হোক কবিতার।


মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর 
ঢাকা 


মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর Reviewed by Pd on অক্টোবর ২৭, ২০১২ Rating: 5

৫টি মন্তব্য:

  1. আকস্মিক নক্কত্রের পতনে হতবাক । অসম্ভব প্রিয় লেখকের ঠিক এভাবে নিঃশব্দে চলে যাওয়া টা এখন ও মেনে নিতে পারিনি -- এবছর শারদীয়া দে হাতে পেয়েছিলাম প্রথমেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় - এর উপন্যাস টি খুলে বসেছিলাম - "সরস্বতীর পায়ের কাছে " -- প্রশ্ন জাগে মনে সামনের বছর শারদীয়ায় কার উপন্যাস পড়ার জন্য এতো প্রতীক্ষা থাকবে -- তবুও প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে চলে যাওয়া নীরার প্রেমিক কে জানাই বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা ।।

    সম্পাদকীয় কলমে এবারে আপনাকে পায়ে সত্যি ভীষণ ভালো লাগছে । আপনাকে শ্রদ্ধা ও প্রনাম ।।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর।বুধবার, অক্টোবর ৩১, ২০১২

      আমি প্রীত আপনার সুন্দর মন্তব্যে।

      হ্যা, সাহিত্যপ্রেমী কেউই পারছি না মেনে নিতে এ নির্মম সত্য। প্রিয় কবি এভাবে চলে গেলেন ... এভাবেই আচমকা নক্ষত্রের পতন!

      ভাল থাকবেন কবি অনন্যা।

      মুছুন
  2. পূজোর ছুটীতেই নীললোহিত হারিয়ে গেল দিকশূণ্যপুরে,সাথে নিয়ে গেল কাকাবাবু-সন্তু,নীরাকেও। সাহিত্যপ্রেমী বাঙ্গালীর কাছে ম্লান হয়ে এল শারদীয়ার উচ্ছ্বাস, ঈদের আনন্দ।শব্দের মিছিলে শৈল্পিক সম্পাদকীয়র শুরুতেই সে বেদনার রেশ,কবিতাতেও তার প্রতিফলন পেলাম।।যেন আমার মনের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতের গতিবেগ শব্দের মিছিলের জানা! দারুণ । মন ছুঁয়ে গেল। ধন্যবাদ এই উপহারের জন্য, আশা করব শব্দের মিছিলের সব লেখা এভাবেই যেন ছুঁয়ে যায় সমস্ত গুণগ্রাহী পাঠক/পাঠিকাদের । অনুপ্রাণিত করবার প্রয়াসে আমার ইচ্ছেগুলোকে এখানেই ছেড়ে দিলাম ।

    উত্তরমুছুন
  3. অপুর্ব শ্রদ্ধা নিবেদন। খুব ভালো লাগলো।
    এমন দিনে নীরার পাশে থাকার জন্য সঙ্কল্পবদ্ধ থাকলাম।
    সঙ্কল্পবদ্ধ থাকলাম- সুনীলে লীন থাকতে ।

    উত্তরমুছুন
  4. বিনম্র শ্রদ্ধা রইল সুনীলে ~~


    আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রইল , অতিথি সম্পাদক মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর এর প্রতি ।

    উত্তরমুছুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

banner image
Blogger দ্বারা পরিচালিত.