কদমের পাপড়ি ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছিল অঝোরে। শিলিগুড়ি থেকে আনা ফ্যামিলি সাইজের ছাতার নীচে দাঁড়িয়েও পরশ ভিজে যাচ্ছিল, তার আবার অল্পে ঠাণ্ডা লাগে। অফিসের উল্টোদিকে বাস স্ট্যান্ড লাগোয়া এই কদম গাছটা বেশ ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে দুই বছরে, এতটাই যে তার নীচে বেশ দাঁড়ানো যায়। বনদপ্তর থেকে যখন গাছ লাগাতে এসেছিল তখন এই জায়গাটার কপালে লেখা ছিল ফুরুস ফুলের একটি গাছ কিন্তু কেন কেউ জানে না সেই হাওয়ায় ওড়া ফুলগুলো বাদ দিয়ে কদম তার জায়গায় এল আর এমন করে এল যে তার মাতাল করা রূপ- গন্ধে পরশ ভেসে যাচ্ছে। কদম বর্ষা র খুব প্রিয় ফুল, অন্তত পরশের তো তাই মনে হয়, না হলে রোজ অফিস ছুটির পর বাস ধরতে এসে ফুল পাড়ার জন্য ইতিউতি চায় কেন? পরশের খুব ইচ্ছা হয় ওকে ফুল পেড়ে দিতে কিন্তু ও মেয়ের যা তেজ তাই ভেবে সাহস করে না, কেবল দাঁড়িয়ে থাকে গাছতলায় ওর সুগন্ধের পরশ পেতে, ভাবটা এমন যে বাস ধরবে, কিন্তু বর্ষা চলে গেলেই ও উল্টো দিকের বাস ধরে।
বর্ষা এই অফিসে এসেছে প্রায় দু বছর হতে যাচ্ছে, ওর মত আরও কজন কলার দের কালেক্ট করা ডেটা নিয়েই পরশদের ভিজিট করতে যেতে হয়, সেই সূত্রেই বর্ষার সাথে যেটুকু কথা, তবে তা কাজের গণ্ডীর বাইরে কখনোই যেতে পারে না পরশের ভীত লাজুক ভাব আর বর্ষার গাম্ভীর্যের কারণে অথচ ওরা দুজনেই আদতে এমন নয়, বর্ষা তো বেশ মাতিয়েই রাখে অফিসটা শুধু ওর সাথে কথা বলতে গেলেই নিজেকে মুড়ে নেয়, আর পরশ ও এতটা ভীত নয় মোটেই কিন্তু বর্ষার সাথে কথা বলতে গেলেই ওর কথা জড়িয়ে যায়।
পরশ বর্ষা কে ভেবে রোজ কত চিঠি লেখে যদিও তারা কোনোদিনও তার হাত অবধি পৌঁছতে পারে না। কিন্তু সে চিঠি লিখে লিখে পরশের হাত গেছে খুলে, এখন তার লেখা সত্যিই লেখার মত আর সেদিন সুহৃদ এর ছেলেমানুষীতে সে যা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছিল সে কথা ভাবলে আজ এই বৃষ্টি দিনেও সে ঘেমে যাচ্ছে। সুহৃদ কে খবরটা জানানোই ছিল তার ভুল, কিন্তু তার এই আনন্দের খবরটার ভাগ নেবার কেউ ছিল না বলেই সে ওকে জানিয়েছিল যে এবারের “ বিদেশ “ পত্রিকার বর্ষা সংখ্যায় তার একটা লেখা ছেপেছে, আর সুহৃদ অফিসে তা রাষ্ট্র করে। ভালই লাগছিল যখন সকলে বই টা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল পিঠ চাপড়াচ্ছিল আর পরশ ভাবছিল যে এই দরজা দিয়েই হয়ত বর্ষার মনের খোঁজ মিলবে কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো, সমিধা লেখাটা বর্ষাকে দেখানোর পরেই ওর চোখমুখ আরও কঠিন হয়ে গেল আর ঘৃণার সে দৃষ্টিতে পরশের সব খুশী কোথায় মিলিয়ে গেল। সেই থেকে এখন অবধি পরশের মনখারাপ, আজ সে ক্ষমা চাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সত্যিই সে খুব অন্যায় করেছে ঐ লেখাটা অফিসে এনে দেখিয়ে, ওটা পড়লে যে কেউ বুঝবে সামনের ঐ কদম আর তার নীচে অপেক্ষমাণ যুবকের প্রেমের কথা যে কখনো তার দয়িতা কে বলতে পারে না যে সে তাকে কতটা ভালবাসে।
আজ বর্ষা আসতে খুব দেরি করছে, এতটাই রেগেছে মনে হয় যে পরশ চলে না গেলে হয়ত এখানে আসবেই না, নিজেকেই নিজের খুব ছোট লাগছে, মন খারাপটা কান্না হয়ে উঠে আসতে চাইছে গলা বেয়ে ভরসা শুধু বৃষ্টির জল। পরশ আর দাঁড়াবে না ঠিক করে আর তখনি বর্ষার গোলাপি পোশাকের কিছুটা চোখে পড়ে, সাহসে ভর করে দাঁড়িয়ে যাওয়াই মনস্থ করে পরশ, আজ একটা এসপার ওসপার হয়ে যাক। বর্ষা যথারীতি গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়াতেই আজ শত্রুর মত ওর বাস এসে পড়ল আর বাসে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে একেবারে আচমকা একখানা কাগজ পরশের হাতে দিয়ে সে বাসে উঠে মিলিয়ে গেল।
সেই কাগজখানা হাতে নিয়েই আজ পরশ ভিজে যাচ্ছে , কদমের পাপড়ি চোঁয়ান জলে ধুয়ে যাচ্ছে ওর সব কান্নারা, চোখ শুধু ফিরে ফিরে যাচ্ছে হাতে ধরা কাগজে যেখানে লেখা আছে---
আয় ভিজি
গরম হাওয়া বেমালুম বেপাত্তা
সারা গায়ে খেলে যাচ্ছে ভেজা শীতল বাতাস
পাওয়ার নেই তবু আরাম, আর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরেটা ছুঁতে চাইছি
বড্ড ঠাণ্ডা জলের অবিশ্রাম ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার হাতের পাতা থেকে কনুই এর ওপর অবধি
মুখটা ও জলের ফোঁটায় ভরে গেছে সাথে সামনের চুলগুলো কপালে লুটোপুটি
আমি জিভ বার করে জল নিচ্ছি মুখে
আকাশ টা কালো ভূত আর পুকুরের তল টা কি অস্থির
যেন কাজলা দীঘি, রাস্তাগুলো নদী হয়ে গেছে।
কাগজের নৌকাও ভাসাতে পারি শুধু জানি যে ডুবেই যাবে শেষে তাই আর ভাসালাম না
চমকেছি খুব জোর, একটা বড় বাজ পড়ল কোথাও, সকালের জ্বালা গরম টা উধাও যেন ছিলই না কখনো।
দোলনচাঁপা ধর
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:
Reviewed by Pd
on
জুলাই ১১, ২০১৫
Rating:


কোন মন্তব্য নেই:
সুচিন্তিত মতামত দিন